তুই সিরিজ -

         
(১)

তুই এলি -  

এই ছিলো তোর মনে ?
সেদিন আমের বনে –
বর্ষা যখন উথাল পাথাল 
ডাক পাঠালি তুই।

কেমন করে যাই – ?
তোর কাছে তো বৃষ্টি ছিল –
সবুজ সবুজ পাতার ফাঁকে,
রোদ যেন সে, লজ্জা ঢাকে,
শ্রাবণ মেঘের উতল ঝড়ে
বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে।
টুপ টুপ টুপ আওয়াজ নিয়ে
ঘরকন্না ছেড়ে দিয়ে –
হঠাত কেন ডাক দিলি তুই,
সেদিন অমন করে ?
ভেসে আসা ডাকের সুরে –
মনটাকে তুই, নিজের করে
আনলি আমের বনে।
তোর সে ডাকে, মাতাল হাওয়া
বলল আমার কানে –
এক্ষুনি যা, এক্ষুনি যা –
নইলে যাবে বৃষ্টি ধরে 
শ্রাবণ মেঘের আকাশ ভরে -
রোদ উঠবে হেসে।
বকুল পারুল কদম গাছে
ভিজে বাতাস থমকে আছে –
পাতার মুখে জল টুপটাপ
এই খসল ব’লে - ।
তোর সে চোখে অবাক চাওয়া
পিঠের ওপর সে কোন মায়া –
টানলো আমায় তোর দিকে, তাই
ছুটে গেলাম কাছে।
বৃষ্টি ভেজা সারা শরীর
জল থই থই হলদে নদীর
বাঁকে বাঁকে ফুটে আছে –
কত দোলনচাঁপা।
এক এক করে স্পর্শ নিয়ে
চোখের পাতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে –
বুক ভরানো গন্ধ নিয়ে, 
থামল আমার মন।             

তোর মনেতে তোর শরীরে
মিশে গেলাম ধীরে ধীরে –
বৃষ্টি এল তুফান তোড়ে –
অন্ধকারের সাথে।
নাম-না-জানা সে কোন পাখী
শীষের সুরে জমিয়ে দিলো -
মেঘমল্লার রাগ।
তুই তো তখন জাপটে ধরে –
চুমোয় চুমোয় আঁজলা ভরে,
নিঙড়ে নিলি আমার মনের
গোপন যত দাগ।


(২)

আবার এলি তুই –

আবার এলি আজ।
কেন এমন সাজ ?
সকাল থেকেই আকাশ কালো
আবছা আলো আবছা আলো
তারি মাঝে অকূল কূলে
ফের এলি তুই  
দুহাত তুলে –
শ্রাবণধারার মতো।
উপছে পড়া পুকুর জলে
থই থই ঢেউ 
কাঁপন তোলে –
ঠিক যেন তোর ছায়া !
অমন করে নেচে নেচে
পাগলী যে তুই
এলি কাছে –
কেমন করে ধরি ?
বৃষ্টি ভেজা হাতের পাতায়
জল ছুঁয়ে যায় 
বুকের খাতায়-
তোর কি মনে পড়ে ?
সেই অবেলায় –
দুপুর বেলায় –
জানলার দুই ধারে ?
ভেতরে তুই 
বাইরে আমি,
দুটি চোখের কানাকানি –
       যাইনি ভুলে আজও।
       

হারানো সেই দিনগুলো সব
মনের কোণে আজো নীরব –
বৈঁচি ফুলের মতো।
আজ দুপুরের তোর এ খেলা
পুকুর জলে সারা বেলা - 
জলের ফোঁটায় আছড়ে পড়ে
ধাক্কা দেওয়া যত। 
শ্যাওলা ঘেরা মাছের গায়ে
হাত বাড়ালেই –
ফস্কে যাওয়া, 
জলের সে দাগ যায়না ধোয়া 
ঠিক যেন তোর মতো।


তুই এলি আজ 
এই দুপুরে
মন কেমনের উদাস তীরে -
বাদল হাওয়া বইছে ধীরে -
কদম ফুলের গন্ধ ঘিরে -
ধরলি আমায় 
অবাক করে
সকল কাজের মাঝে।
হঠাৎ আমি কিসের টানে
পাগল হলাম সেই উজানে
বৃষ্টি পড়ার সাজে।
কখন সোজা, কখন বেঁকা
হাওয়ার দোলায় থোকা থোকা
ঝরে যাওয়া
বকুল ফুলের  
সেই কবেকার রাতে। 
দুহাত দিয়ে আঁজলা ভরে
মুখখানি তোর আদর করে
গালে গালে ছুঁয়ে দিলাম
বকুল ফুলের সাথে।
কেঁপে উঠে, তোর ওই মুখে
চুমো দিলাম মনের সুখে –
বর্ষা তখন লজ্জামুখে
সরে গেল দূরে।
ছেড়ে দিয়ে একটু সময় 
আকাশ কালো করে।
           
(৩)

অভিমানে তুই – 

কেন এত রাগ তোর ?
এত অভিমান ?
বুকের ভেতরে জমছে কেন-
ঘুম পাড়ানোর গান।
শ্রাবনের এই বর্ষাবেলায় –
আকাশ যখন ভিজে, 
অভিমানের ব্যাথায় কেন
মরিস নিজে নিজে।
তোর যে আকাশ অনেক বড়,
যদিও মেঘে ভরা –
তাই বলে তুই এমন করে –
নিজের মনে একলা ঘরে –
অলস বাতাস জাপটে ধরে –
মন কেমনের শুকনো বুকে
করবি এমন ধারা ?
রিন রিন রিন চুড়ির আওয়াজ,
কেমন যেন লাগছে যে আজ,
উদাস উদাস ভাবখানা ওই
আমার কানে বাজে।
দুপুর বেলায় শূন্য সোফায় –
বৃষ্টি যখন
গান গেয়ে যায়-
কাঁঠাল গাছের গায়ে –
রিম ঝিম ঝিম
সেই আওয়াজে,
মন কেন তোর সাজিয়ে চলে
ভায়োলিনের সুর।
আমায় নিয়ে ভাবনা যে তোর-
নয় যে অলীক,
নয় যে পাথর,
যায় না তাকে ফেলা।
তবু কেন, এমন করে –
হাল্কা রাগে
ঠেলিস দূরে –
তোর সে লালন-গান।
মনের ভেতর টান -
যতই বাড়ে -
পুকুর পারে
সন্ধ্যে নামার পর।

ঘরের আলো আরশিজলে
কেঁপে কেঁপে ঘুরে ঘুরে
পাড়ের দিকেই যায়।
পুকুর পাড়ের সেই সে ধারে
আলো মেশে অন্ধকারে –
সেই খানেতেই তোর আমি যে
অবাক চোখে চায়।
সে কোন ইশারায় ?

তোর সে ডাকে আকাশ ভাঙে
শ্রাবণ রাতের মধ্যযামে –
আমি তো কোন ছার !
তোর সে অভিমানের বেড়া –
অবাক রাতে দূরের তারা -
বিঁধছে এসে আমার বুকে
আধফোঁটা যুঁই হয়ে।
তখন আমার বুকের তাপে
ফুটছে যে যুঁই, অনুতাপের -
গন্ধ মেখে -
সারা পুকুর পাড়ে।
আমি তখন দু হাত ভরে -
খুঁজছি তোকে, চাইছি কাছে
আরো অনেক ক’রে।
সব অভিমান শুষে নিতে
এক নিমেষের তরে।
আমার মনের ভাঁড়ার ঘরে।
চারদিকে জল খেলা করে -
আকাশ উজাড় করে।
একবার তুই আয়না কাছে,
বৃষ্টিপড়া জলের নাচে
সারা শরীর ভিজিয়ে নিয়ে
আমার বাহুডোরে।
দেখব কত অভিমানে -
থাকতে পারিস অন্যমনে,
আমায় দূরে ঠেলে।
আবার আমি মাতাল হব
রাতের শেষে মিলিয়ে যাব
তোর অভিমানের জলে।


            (৪)

দূর আভাসে তুই –

কোথায় এখন তুই ?
কদিন ধরে আসিস্‌নি যে – 
আমার গন্ধ ভরা যুঁই। 
সেই সেদিনে হঠাৎ করে,
কখন যেন গেলি সরে –
সবুজ পাতার ফাঁকে।
বর্ষা-থামা ভিজে পাতায়
খুঁজছি আমি উদ্দামতায় 
তোকে, -  
আলোছায়ার বাঁকে।
থেকে থেকে আমি যে তাই, 
তোর শরীরের গন্ধ যে পাই –
ভিজে হাওয়ার সাথে,
আভাস দিয়ে যাস যে সরে,
স্বপ্ন আমার ভেঙে গ’ড়ে –
গভীর গোপন রাতে।
হাত বাড়িয়ে ধরতে যে চাই
বারে বারে 
এমনি করেই,
তোর সে কোমল মুখ।
কিন্তু কোথায় ?
তোর সে আভাস -
মেঘের ঢালে                                                                           
থাকতে কি চাস –
লুকোচুরি খেলে ?

              আমি তবে ভেসেই না হয়,
টপকে যাবো মেঘের আড়াল –
দুই হাতে মেঘ ঠেলে।
তারপরে তো –
পাগল হব –
হাজার হাজার ঠোঁট ছোঁয়াব,
তোর ওই দুটি গালে।
লজ্জা তখন মুখ লুকোবে
হালকা মেঘে ছড়িয়ে যাবে –
সে কোন অচিন জালে। 
তারপরে তুই আমি মিলে
বৃষ্টি নিয়ে আসব ফিরে –
আবার পাশের বনে।
বর্ষা আবার নামবে ধীরে –
আভাস আমি 
ফেলব ছিঁড়ে,
উড়িয়ে দেবো মাড়িয়ে দেবো
তোর সে যত লাজ। 
আমার মনের কোণে কোণে 
দেখব শুধু আপনমনে 
তোর, - 
বর্ষা-ঘেরা সাজ।

          (৫)

কান্না ভরা তুই – 

কাঁদিস কেন তুই ?
তোর চোখের জলের অঝোর ধারা
কেমন করে ছুঁই।
হঠাৎ করেই কান্না এমন –
চোখের জলেই ঝরল যখন,
শ্রাবণের এই বর্ষাধারায়
ভিজেই আকুল হই।

এই তো সেদিন
তোর চোখেতে
দেখেছিলাম –
শ্রাবণরাতে –
ভিজে হাওয়ায় ফুলের মতন
কাঁপা কাঁপা চোখে যখন –
তাকিয়েছিলিস তুই।
আমি তখন,
কেমন করে –
এনে দেবো,
সোহাগ ভরে –
তোর সে হাসি –
মুখের পরে,
ভেবেই সারা হই।

এমন করে কাঁদিস না আর –
আমার বুকের সব কটা হাড়,
উথাল পাথাল ক’রে।
তোর চোখে ঐ কান্না দেখে,
আমার চোখের ভেতর থেকে –
কান্না ঝরে পড়ে।
কান্নামুখের তোর সে ছবি,
আমায় 
কেমন যেন করে।
যেন
অনেক ব্যথায় আকাশ ভেঙে
অঝোর ধারায় পড়ে –
তোর চোখে ঐ শ্রাবণধারা –
মুক্ত হয়ে ঝরে,
আমার দেখায় কান্না যে তোর
অভিমানের জ্বরে –
আরো ব্যাকুল হয়ে ভরে। 
তোর চোখে ঐ ঝাপসা তারা,
জলের তলায় পাগল করা –
এদিক সেদিক ঘোরে।
ব্যথা আমার চোখে বাজে –
বৃষ্টি সুরের মীড়ের মাঝে,
আমায় মাতাল করে।
সমস্ত দিন ধরে।
কখন পাবো তোর সে ছোঁয়া –
চুমুক দিয়ে শুষে নেওয়া –
তোর সে চোখের জল।
এক্ষুনি তুই বল...


(৬)

ভালোবাসায় তুই –

ভালবাসলি কেন তুই ?
থোকা থোকা সাদা ফুলে
সবুজ পাতা উঠছে দু’লে –
হঠাৎ করে পরীর মতন, 
এলি আমার বুকে।
আমি তখন রাতের শেষে
স্বপ্নগুলো মনে মেখে –
আধো আধো ঘুমের চোখে –
জড়িয়ে নিলাম তোকে।
বললি এসে আমার কানে,
ভিজে গলায় আদুর তানে –
“তোকে ছাড়া কেমন করে -
বলনা, বেঁচে রই ?”
আমি তখন পথ হারানো –
স্বপ্নভেজা রাত ভরানো,
চমকে উঠে
হাতটা বাড়াই –
কোথায় গেলি তুই ?
পরীর মতো ভালবেসে –
এলি কেন, আমার পাশে,
শ্রাবণরাতের বর্ষা শেষের –
অঝোর ধারায় ভেসে। 
বৃষ্টি যেমন হঠাৎ করে –
কখন থামে,
কখন ঝরে –
যায় না তাকে বোঝা।
তেমনি কি তুই –
অমন করে –
ফিসফিসিয়ে কানের কাছে –
বললি ভিজে সুরে -
এত ক’রে, -
কেন আমায় খোঁজা ?

আমি আছি তোর শরীরে,
তোরই গায়ের গন্ধ ঘিরে –
তোরই চোখের ইশারাতে
আসব আমি ফিরে ফিরে –
যখন ডাকিস তুই।

তোর সে ডাকে কত মায়া –
আবছা আঁধার ছায়া ছায়া –
সেই আঁধারেই
বারে বারেই –
করব আসা যাওয়া।
জাপটে আমায় রাখিস ধরে –
অনেক, অনেক যত্ন করে –
তোর সে পরম চাওয়া।

(৭) 

চাওয়া পাওয়ায় তুই –


কখনোতো চাস নি কিছু –
আমার কাছে !
আমের গাছে পাতার মুখে
বকুল যখন ফোটে সুখে,
তেমনি করে, তোর সে চাওয়া
জানব কেমন ক’রে।
বল্‌ না কিছু, ইশারাতে –
মধ্য রাতে –
যখন সবাই 
চুপ করে যায়।
সেই প্রহরের এক অবেলায় –
বল্‌ না কিছু 
যা খুশী তোর – ।
দেখ্‌না, আমি পারি কিনা,
হাত বাড়িয়ে তোর জন্যে, 
আনতে একটা, রাঙা সকাল –
কিংবা সবুজ ভোর।
আচ্ছা না হয়, অন্য কিছু -
হলুদ শাড়ী নীলচে আঁচল, -
কলমী পাতায় শিশিরের জল,-
একমুঠো রোদ অলস সজল ? 
কিছুই তো তুই চাইলি না আর-
আমার কাছে।
তুই কি ভাবিস সবকিছু তোর –
কাছেই আছে ?
তাহলে তুই - 
নে না আমার ভালবাসার একটা চুমুক,
অকূল গাঙে হারিয়ে যাওয়ার দুমুঠো সুখ 
মনের তারে।
তোর সে পাওয়া আমার কাছে –
ফিরিয়ে দেবে সব কিছু সুখ
অন্ধকারে –
বুকের প’রে। 


(৮)

ফুলের গন্ধে তুই - 

চাঁপার গোপন গন্ধ মেখে 
হঠাৎ এলি কোথা থেকে ?
আকাশ আমার ভরিয়ে দিয়ে - 
সবুজ চাঁপার মৌ’য়ে।
তুই তো ছিলিস কদম ফুলের
বর্ষামুখর ঘ্রাণে –
আজ যে তবে চাঁপার সুবাস,
সারা শরীর, মনে ?
আর তো কদিন –
দেখবো যেদিন,
শিউলি সুবাস মেখে –
নীলচে আকাশ ভরিয়ে দিবি
হঠাত থেকে থেকে। 

কমলা সাদায় ভরবে উঠোন 
রোজ যে নতুন ভোরে
সাঁঝের বেলায় গন্ধ পাবোই
তোর চলার পথের ধারে। 
আনবি খুশী আনবি হাসি, 
আসবি পূজোর মাঝে –
শিউলী সুরভ ছড়িয়ে দিবি,
সারাদিনের কাজে।
স্বর্ণচাঁপার সৌরভেতে
মাতাল করে দিয়ে –
কত দিনের পরে এলি
গন্ধ বুকে নিয়ে।
তোর তো আছে অপূর্ব এক
গন্ধঢালা স্বাদ –
ফুলের সুবাস কি প্রয়োজন
থাক না ওটা বাদ।
তোর সে গায়ের গন্ধ মেখে
কাটাই আমি মনের সুখে –
যেদিন আসিস তুই।
দূর থেকে তাই বুঝতে পারি
আসছে আমার গোপনচারী –
সবুজ বনের পথে।


তাই তো কোনোমতে,
আসিস যখন 
আমার দৃষ্টিপথে,
অপূর্ব সে গন্ধমাখা –
নিঝুম পায়ে আঁকাবাকা,
আতর শরীর সাথে।
অবশ করা গন্ধে মাতাল
তুই যে আমার আকাশ পাতাল
সারাক্ষণের মন।
আয় না তোকে দিই সাজিয়ে
নয়নতারার গন্ধ দিয়ে –
আমার আজীবন।


(৯) 

লজ্জাভেজা তুই - 

পারিস বটে তুই !

লেবুতলায় সন্ধ্যেবেলায়,
যখন ফোটে যুঁই।
তাকিয়ে দেখি তুই !

অনেকদিনের পরে তোকে 
দেখেও লাগে সুখ।
কিন্তু এ কি ! আজ যে দেখি  
লজ্জাভরা মুখ !
পানের মতো সবুজ মুখে –
কমলাবরণ ঠোঁট। 
ওটাই দেখে বুঝতে পারি - 
লজ্জারা একজোট। 
চলকে পড়ে রোদের আভা
তোর সে অমন মুখে -
আমি তখন বুকে
শুনছি মেঘের গুরুগুরু,
গাছের পাতায় দোলা।
এই বিকেলে হঠাৎ যেন –
পুকুরজলের ওপরপানে,
জলের - 
ছলাত ছলাত খেলা।
লজ্জারাঙা তোর চাউনি
ভাঙছে আমার মনে, 
দিচ্ছে আমার রক্তে দোলা 
বুকের’ই চার কোণে।
কত রকম,
রকম-সকম,
ক্রিয়াপদের মতো,
চাউনি যে তোর -
করে আমায় –
মুগ্ধ অবিরত।
“কান্না হাসির দোল দোলানো”
লজ্জা, অভিমান।
তোরই মুখে মানায় শুধু,
বিশেষণে’র গান।  
নানান বেলায়,
নানাম রূপে – 
তোকেই দেখি,
পরম সুখে
খেলিস আমার সাথে।
সকাল, দুপুর, বিকেল বেলা
আর,  
দিনের পরে রাতে -
থাকিস আমার সাথে।

তাকিয়ে তুই দূরে,
সলাজ চোখে দেখিস কেন –
আমায় বারে বারে ?
কত কথাই মনে পড়ে –
তোর - 
চোখের পানে চেয়ে।     
লজ্জা-ভরা তোর সে মুখে, - 
চোখটা বুঁজে থাকিস সুখে,
কখন পাবি আমার চুমো
ভিজে ঠোঁটের ধারে –
বিকেল রোদের আলো যখন,
অস্তাচলের পারে।



(১০) 

শরত ভোরে তুই –


সকালবেলায় ঘাসের ডগায় –
তোর ভিজে পা’য়  
কেবল জড়ায় -
শিউলি ফুলের বোঁটা।
সন্ধ্যে বেলায় ফোটা –
তখনো সজীব, তখনো সজল,
সাদা পাপড়ির টলটলে জল –
ভোরের রোদে মাখা।
অপূর্ব সে আঁকা –
মোনালিসার ছবির মতো,
চোখদুটি তোর –
কার তরে রে বাঁকা ?
আলতো পায়ে চলতে থাকিস,
এদিক ওদিক চেয়ে।
ওরে অবুঝ মেয়ে,
দেখি দুচোখ বেয়ে -
ভেজা পায়ে সূর্য হাসে –
শিউলি ফুলের পাশে পাশে
সবুজ মিঠে ঘাসে।
তোর নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে-
নরম বুকের উথাল পাথাল,
ভরিয়ে দিল চোখ,
তোর, 
সে মুখের কোনায় হাসি –
পায়ের চাপে ফুলের রাশি –
দূর বনেতে বাজছে বাঁশি –
আমার, 
জাগছে মনোলোক।

নরম রোদে তোর সে ছাওয়া
শিউলি ভরা অল্প হাওয়া,
ভাসছে আমার বুকে।
তোর সে গোপন সুখে
মাতাল আমি ভোরের বেলায় –
চলছি যেন তোর ইশারায় –
টলোমলো পা’য়।
ধরতে যে চাই তোকে বুকে 
পেছন থেকে অবাধ সুখে,
হঠাৎ টেনে ধরে।
তারপরেতে অবাক করে,
পেছন থেকেই দেব তোরে
তোর ঐ গ্রীবায় চুমো ! 
তোর চুলেরই গন্ধ মেখে
উঠব কেঁপে থেকে থেকে –
জড়িয়ে ধরে তোকে।
তারপরে তুই, ঘুরেই আমায় –
করবি আদর, 
শিউলি তলায় –
শরৎ মাখা ভোরে।
পাতায় থাকা শিউলিগুলো
পড়বে আবার ঝরে, 
শিউলি মাখা ভোরে।  


(১১) 

নদীর পারে তুই -


দেখছি তোকে নদীর পারে -
ভোর না হতেই জলের ধারে,
খুঁজিস কাকে তুই ?
অচেনা এই নদীর পারে,
গাছ-আগাছায় ঝোপে ঝাড়ে -
হঠাৎ দেখি, কমলা শাড়ী,
এদিক ওদিক ঘোরে।
বাসি চোখে তাকাই আমি
একটুকু আঁচ করে।
যা ভেবেছি - তাই !
আমার খোঁজে হন্যে হয়ে -
এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে,
খুঁজতে আসা চাই।

ঘেঁটুফুলের গন্ধে উতল
জলের মৃদু হাওয়া -
মুখটা তুলে তোর সে সলাজ 
অবাক চোখে চাওয়া।
দূরের পানে আবছা ছবি -
ওপারে ধানক্ষেতে,
সবুজ ধানের পটের ওপর
তোর
কমলা শাড়ী ফোটে।
লজ্জারাঙা দুটি পা’য়
ছন্দ দুলে ওঠে।

এমন করে কেন আমায় –
পাগল করিস তুই। 
হঠাত করে যেথায় সেথায় –
খুঁজতে থাকিস শুধু আমায়,
তুই যে আমার যুঁই।
সন্ধ্যে বেলায় ফুটে উঠে,
গন্ধ ছড়াস দিক-বিদিকে –
ভোরের সুরে ঝরে পড়িস,
শুধুই আমার তুই।
দেখিস চেয়ে চেয়ে।
ঝরে পড়া কদম দানায় –
পা ফেলতে –
ভয় বুঝি হয় !
সকাল বেলার ঘাসে। 
গাছের ডালে দোয়েলগুলো
শিষ দিয়ে খুব হাসে।
তারপরে তুই
আমায় দেখে –
অবাক হাসির,
ঝর্ণা মেখে –
উদাস হয়ে গেলি।
নদীর দিকে তাকিয়ে দূরে,
মনের মাঝে ঝালা’র সুরে
থামলি হঠাৎ করে। 
তখন আমি পেছন থেকে –
জাপ্‌টে ধরার স্বপ্নটাকে –
দিলাম হাওয়ায় ছেড়ে। 
নদী তখন বললো তোকে –
পেছনে দেখ্‌ -
এসেছে কে !
আমার দুহাত তখন থেকেই, 
তোকে - 
ছোঁয়ার আশায় ফেরে।
এই নদীটির তীরে।


(১২)

চতুর্থী’তে তুই –

হঠাৎ করে সাত সকালে –
মাইক শুরু 
নাচের তালে।
সাঙ্গ হলো চাওয়া।
কবে থেকে শিউলি ফুলে –
মা আসছেন হেলে দুলে,
এল খুশীর হাওয়া।
ঢাকের কাঠি ধুলো ঝেড়ে – 
বাজতে থাকে চেনা সুরে,
শারদ আকাশ ঘিরে। 
বোধন এখন দুদিন বাকি –
কত কাজের দাপাদাপি,
বাইরে ভেতরে। 

ব্যস্ত ছিলাম নানান কাজে,
মনের কোনে বাঁশি বাজে –
কি যেন নেই-, নেই ! 
তাকিয়ে দেখি তুই ! 
লালচে পাড়ের গরদ শাড়ী –
লেপটে আছে গা’য়,
লাল চোলিতে বুকটা ঘেরা,
নুপূর দেখি পা’য় ! 
তোর সে কোমল হাতে –
রিন রিন রিন চুড়ির ঝনক্‌
মাঝে মাঝেই বাজে।
আমার বুকের মাঝে –
হৃদয়খানা ওলোটপালোট -, 
গুমরে মরে লাজে।

তোর সাথে সেই শেষ দেখা যেই –
হ’ল নদীর পারে, 
তখন বারে বারে,
শুধিয়েছিলেম তোকে –
কবে নিবি পুজোর শাড়ী - 
এবার মেলার থেকে ?
হেসে উঠেই পালিয়ে গেলি
দূরে,  
ওই নদীটির দিকে। 

এবার দেখা অকস্মাৎই
পুজোর দালান কোনে –
কি এক অন্যমনে –
তাকিয়ে ছিলি আবছা চোখে,
মায়ের চোখের পানে।
আমি দূরের থেকে -  
একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলাম
মায়ের মুখের দিকে।  
একটু পরেই তোকে, 
অবাক চোখে –
দেখতে পেয়ে পথ হারালাম,
মায়ের মুখের থেকে।
দুই মুখেতেই 
চোখ ফেরালাম –
এদিক সেদিক করে।
মায়ের মাথায় শোলার মুকুট,
দু কাঁধে চুল দোলে,
তোর মাথাতে কাঠগোলাপের –
অঙ্গশোভা খোলে।
দুহাত জড়ো করে –
স্থির হয়ে তুই দাঁড়িয়েছিলি 
এককোনে একমনে।
মনে হ’ল,
আইবুড়ো মা, যেন প্রহর গোনে ! 
সপ্তপদীর স্বপ্নে বিভোর –
এই পুজো প্রাঙ্গণে।
আমি তখন আকাশ-বানী
চাইছি মনে মনে।
দেখিস মা তুই –
দু-প্রাণ যেন সুখে -, ঘরের কোনে,
সাজিয়ে তোলে রঙবাহারী মরশুমী ফুল
ফাগুন আগমনে।
তুই ফোটাবি ফুলের কুঁড়ি –
জলের ঝারি হাতে।
আমি থাকবো - 
তোরই সাথে।
ফুল ফুটলেই পরাগ রেনু,
ভাসবে হাওয়ার উড়ে। 
প্রজাপতির পাখায় ভেসে,
ছুঁয়েই যাবো তোরে -,   
রাঙিয়ে দেবো পায়ের পাতা –
আলতা ভরা হাতে।  
দুহাত দিয়ে মুখটা আড়াল
করবি সাথে সাথে। 
লজ্জারাঙা মুখে, 
সে কোন গোপন সুখে –
আঙুল-ফাঁকে দেখবি চেয়ে,
আমারই মুখটাকে।


(১৩) 

আয় না রে আজ তুই - 

হঠাৎ তোকে পড়লো মনে –
মা’য়ের চলে যাবার ক্ষণে,
একান্ত আনমনে।  
আনমনেতেই –  
এলি যে তুই –
আমার চোখের কোনে ;
অনেক সঙ্গোপনে।
উতল হ’ল মনটা আমার –
ঢাকের সুরে ঢাকের তালে।
মা চললেন শ্বশুরবাড়ী –
ধূনোর ধোঁয়ায়, চোখের জলে।
ঠিক তখনই ইচ্ছে হল 
অবাক করে দিয়ে   
তোকেই শুধু নিয়ে - 
জাপটে ধরে নাচব আমি, তাসাপার্টির সাথে - 
বিসর্জনের পথে।
অনেকটা পথ নাচবো, যাবো  
দুজনে একসাথে।

লজ্জা নিয়ে তুই –
আমার সাদা যুঁই,
চাইবি যেতে স’রে,
আমার থেকে দূরে। 
ছাড়বো নাকো তোকে - 
আরো দ্রুত নাচবো আমি
তোকেই নিয়ে সাথে।

এরপরে, মাঝ রাতে –
মা ভাসবেন নদীর জলে,
কৈলাসেরই পথে।
আমি তখন চোখের কোনে –
জল মুছিয়ে দিয়ে,
তোকে নিয়ে সরে যাবো 
ঘাটেরই এক ধারে।
নিঝুম অন্ধকারে –
সেই সে নদীর পাড়ে –
মেখে নেব গন্ধ, চুলের,
তোর কাঁধে হাত রেখে।
ভরিয়ে নেবো গালটা আমার,  
হাজার চুমো মেখে।
নদীর সে জল বয়ে যাবে 
ফুলমালাতে ঢেকে।


(১৪)

আয় না কাছে তুই –


কিচ্ছু ভাল লাগছে না রে –
আয় না রে তুই নদীর পাড়ে –
সন্ধ্যেবেলা।
কিংবা – একটু বেলা, 
থাকবে  
যখন অস্তাকাশে –
হাত বাড়িয়ে ধরতে যাবো,
নদীর ধারে, গাছের পাশে।
পাই যেন তোর চুড়ির ঝনন্‌, –
গায়ে’র সুবাস আলগা আঁচল,
লাল্‌চে রঙের অস্ত আকাশ 
অন্য পারে।
বারে বারেই ধরবো তোকে –
অলস হাতে।
যেন কোনো দূর নিরালায় –
সূর্য যেথায় অস্ত না যায় ;
তোর ঐ ভিজে চোখের পাতার,
তারা’র সাথে।
কাঁপবে বেণী পিঠের ওপর,
তোর সে চলার ছন্দে বিভোর -,
আমার তখন পাগল পাগল
মনে হবে।
মনে হবে কখন তোকে –
জাপটে ধরে নিজের বুকে,
একলা হবো।
হাস্নুহানার গন্ধ আমি -
কখন পাবো !
তোর ঐ নরম -
বুকের থেকে। 

কোথায় গেলি ? আয় না কাছে,
উথাল পাথাল মনটা নাচে –
আলোর সাথেই। 
তুই তো আবার এসে থেকেই
বলবি শুধু যাবার কথা –
বারে বারেই।
কেন এমন করিস যে তুই –
আমায় নিয়ে এমন ক’রে।
কান্না আমার দেখতে কি পাস - 
তোর ঐ বুকের গোপন ঘরে ?
মাঝে মাঝেই, বারে বারে।
এবার আমি ঠিক করেছি,
পালিয়ে যাব -,
পালিয়ে যাব তোরই সাথে।
তোর সে গা’য়ের গন্ধ হ’য়ে –
তোর সে নরম বুকটা ছুঁয়ে –
থাকব আমি - 
চির’টা কাল,
সুবাস মেখে হাল্কা হয়ে –
তোর ঐ শাড়ী’র ভাঁজে ভাঁজে।
তোর শরীরের সকল খাঁজে।
পালিয়ে যাবই, এবার আমি –
তোরই সাথে -
সবার মাঝে।

(১৫)

তুই ছিলি কাছে –

কতদিন ধরে ভুলে আছি তোকে –
তোর’ও তো মনে পড়েনা আমাকে।
তাই কাটাকুটি হয়ে গেল আজ
সকাল সকাল –
আয়, দেখি তোর সাজ,
দেখি আজ -
দুচোখ ভ’রে।
কতো দিন হলো ? –
ভুলে গেছি তোরে ?
সত্যি কি তাই !

কোলভা’র ঢেউএ দেখেছি যে তোকে –
দুপুর বেলায়, 
অলস খেলায় ছিলি তুই মেতে।
এক ঢেউ ভেঙে অন্য নতুন- 
ঢেউয়ের গায়ে।
নীলচে সবুজ আঁচল ছেয়েছে –
রোদের আড়ালে।
ঝিকমিক ঢেউ এলমেলো হয়ে –
তোকেই জড়ায়।
আকাশের গায় –
ছোট ছোট মেঘ, ভেসে ভেসে যায়,
তাদের পাড়ায়।
তুই, এক মনে ভুলে গিয়ে সব,
সাগরের পানে তাকিয়ে নীরব –
ঢেউ এর খোঁজে।
আরব সাগর ফিরে ফিরে আসে –
তোর গায়ে মাখা সুচারু সুবাসে,
জড়াবে বলে।
আমি দূর থেকে দেখেছি সে খেলা,
সারাটি দুপুর কেটে গিয়ে, বেলা –
গিয়েছে চলে-।

কখনো আবার ‘মোরজিম’ বীচে –
সোনালী বালির বুক চিরে চিরে,
গিয়েছিস হেঁটে।
কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে –
নেমেছিলি জলে,
পরপর ঢেউ, ওঠে আর পড়ে
বারবার শুধু - 
ভাঙে আর গলে - 
নিজের খেয়ালে।
তোকে নিয়ে ঢেউ,
কতো মাতামাতি ! 
জড়িয়ে পেঁচিয়ে – 
জাপ্টে সাপ্টে,
নানান খেলা।
আমি মুখ বুঁজে –
হ্যাংলার মতো,
দেখেছি সে কতো ওঠাপড়া যতো,
তোরই সাথে।
ভেতরে ভেতরে রেগেছি, ফুঁসেছি –
অজানা আবেগে দশটা আঙুলে 
ছিঁড়তে চেয়েছি –
কপাল আমার, দুপুরবেলা !

তারপরে তুই, ক্লান্ত শরীরে –
শ্লথ দুই পা’য়ে, এসেছিস ফিরে,
বালুকা বেলায় –
আমার কাছে।
তোর ওই মুখ –
আমাকে আবার, ভুলিয়ে দিয়েছে, 
রাগ, শোক সব গলিয়ে দিয়েই –
আবার নাচে –।
তোর সে কোমল,
নিপুণ, ধবল –
বুকের কাছে !

(১৬)

বইমেলায় তুই - 

আসবি কি তুই আজ ?
শীতের এমন ঠান্ডা হাওয়ায়-
হাল্কা রোদে বইয়ের মেলায়,
আয় না দুজন হাঁটি।
জল ছেটানো ফ্যাকাশ ঘাসে,
হাঁটবি আমার পাশে পাশে
কড়ে আঙুল ধরে-।
মাঝে মাঝে আড় চোখেতে –
দেখবি না হয় যেমন ক’রে 
ঘাড় ঘোরানো পাখী ! 
টিয়া কিংবা ময়না হয়ে
অনর্গলই যাবো স’য়ে
তোর সে ঠোঁটের বকবকানির –
আলগা কারিকুরি।
চারদিকেতে বইয়ের মেলা
করবো না হয় হেলাফেলা -
তোর – 
মুখের দিকে চেয়ে।
ওরে, অবুঝ মেয়ে,
প্রাণ’টা ভরে গন্ধ নেব –
আকুল প্রাণে ভরে দেবো,
বইমেলা চত্বর।
তোর সে খোলা চুলের ছোঁয়া –
লাগবে আমার কাঁধে।
আমি তখন আরো কাছে –
কড়ে আঙুল ছেড়ে দিয়ে
ধরবো গোটা হাত।
তখন কি তুই, লজ্জা পাবি -
এত লোকের মাঝে ?  
খুঁজবো না হয় একটু ফাঁকা –
তোর সে বুকের ভেতর থাকা,
ভোমরাখানার মতো। 
তারপরেতে ছায়ার নীচে,
খেলবে শীতের হাওয়া।

তোর সে বেগুন রঙের শাড়ী,
ঢাকা পরা শালের মাঝে -
করবে আসা যাওয়া।
তোর সে কোমল পায়ের দিকে
যাবেই দুচোখ, এক পলকে –
করবো কি আর বল - ? 
হঠাৎ করে’ই ঢাকবি তখন
টেনেটুনে শাড়ী।
তখন আমি চেয়ে চেয়ে –
দেখবো মেয়ে’র খেলা।
কখন শাড়ী, কখন যে শাল,
কখন আবার দেখবো বেচাল -
সেই আশাতেই কাটবে দুপুর
গাছের তলায় বসে। 
কথায় কথায় কাটবে বেলা
চলবে তখন কথার খেলা –
শিউলি ঝরার মতো।
আমি শুধু খুঁজবো সময়
হঠাৎ করে কখন যে হয় –
একটা চুমু খাওয়া।
তোর দু’গালে গাল ঠেকিয়ে,
যেমন ক’রে বয়ে চলে 
ঠান্ডা দিনের হাওয়া।

তারপরেতে সন্ধ্যে হলে
বলবি যখন যাচ্ছি চলে –
ভাল থাকিস তুই।
আমি তখন বোবা’র মতো
চেপে রেখে গোপন কতো –
ইচ্ছেগুলো উড়িয়ে দেবো
তোর সে চারিপাশে।
হাত ছাড়িয়ে যাবি চলে 
দূরের থেকে দূরে - ।
আমি তখন অলস হতাশ –
তোর সে গায়ের গন্ধ বাতাস 
বলবে এসে কানে,
জোর করে তুই কবে নিবি
তোর সে একার স্বপ্নগুলি –
নিবি বাঁচার মানে।

(১৭)

একবার আয় তুই – 

কতদিন হলো তোকে’তো দেখিনি –
বসন্ত চলে যায়।
কৃষ্ণচূড়া’র মগডালে বসে
সব পাখী গান গায়।
লালচে ফুলেতে গাছ ভরে আছে
শুধু তুই নেই আজ -
কি করে বোঝাই 
আমি যে ভুলিনি 
তোর সে মায়াবী সাজ।
আয় না, আজকে
বেড়াই দুজনে –
গঙ্গার ধারে ধারে।
হাতে হাত তোর ধরে। 
ফাগুন হাওয়ায় গাছের তলায়
তুই আর আমি 
বসে নিরালায়-
তাকিয়ে তাকিয়ে শুষে নেবো শুধু
তোর সে মুখের রঙ।
আচ্ছা না হয় 
নৌকোই নেবো,
গঙ্গার বুকে সাদা পাল তুলে
তুই আর আমি
ভাসবো ভাসাবো
গঙ্গার দুই পার।
ছলাৎ ছলাৎ গঙ্গার জলে
ভেসে চলে যাবো কোন সে অকূলে -
আজ বিকেলের পড়ন্ত রোদ –, 
লজ্জায় ঢেকে মুখ ;
আকাশে ছড়াবে লালচে আবীর
পশ্চিমপাড়ে ছায়া সে নিবিড় 
তাকিয়ে তাকিয়ে মুগ্ধ দুচোখে
তাকাবে যে তোর পানে।
আমি তো তখন 
একমনে মন –
তোর কাছে ঘেঁষে ভাসাবো জীবন
ছই দেওয়া সেই ঘরে।
ছলাৎ ছলাৎ স্বরে।
তারপরে ক্রমে সন্ধ্যা ফুটবে
মাঝগঙ্গায় অস্ত নামবে
আলতো আঁধার, ঘন হয় এলে 
তোকে দেবো এক চুমো।
ছদ্ম রাগেতে সেই গাল মুছে
সরে যাবি তুই 
আমি আরো কাছে –
আরো- আরো - আরো - মুখের কাছেতে
তোর সে শ্বাসের মৃদু হাওয়াখানি
আমার বাঁ গাল ছোঁবে।
দুই হাত দিয়ে অন্ধ আবেগে
জড়িয়ে ধরবো আদরে আদরে 
তোর নীল শাড়ী নদীর হাওয়ায়
ফুলে ফেঁপে উঠে মুখেতে জড়ায়
কতবার কতোবার।
এমনি করেই তোর সেই ছোঁওয়া
বুকে নেব বারবার 
আমার সে পাওয়া –
নদীর বুকেই ভেসে।
আয় তুই অক্লেশে।
করবি না খেলা ?
চুলগুলো নিয়ে – 
আঙুল বুলিয়ে,
মাথার ভেতরে
অনেক সময় ধরে ? 
চুপ করে নিই তোর সে পরশ
চোখদুটো বুঁজে নেব সব রস -
দশ আঙুলের খেলা।
তারপরে রাত এমনি ঘনাবে –
নৌকোর মাঝি নৌকো ভেড়াবে
পুব পাড়ে, সেই কূলে।
আবার যে তুই চলে যাবি দূরে –
মনটা খারাপ করে।

নামবার আগে বুকে নিয়ে তোকে –
আদরে সোহাগে চুমো এঁকে এঁকে
করবো কত না খেলা।
তোর সে চুমোর গভীর সে ঘ্রানে
আসবে ফাগুন আমার সে প্রাণে –
আবার আচম্বিতে।
তুই লজ্জায় লাল করে গাল
আড় চোখে চেয়ে দেখবি মাতাল
কেমন করে হই।
শেষ চুমোটার আবেশ মাখিয়ে
চলে যাবি তুই নদীর ওপারে –
একলা আমায় রেখে।।


(১৮)

দার্জিলিং-এ তুই --

দার্জিলিংএ ম্যাল এর কোনে
কেন এমন অন্যমনে
দাঁড়িয়ে আছিস তুই !
হঠাৎ করেই দেখতে পেয়ে
মন যে আমার উঠল গেয়ে,
তুই যে আমার স্বর্ণচাঁপা -
তুই যে আমার যুঁই।
তোকে কেমন করে ছুঁই ?

পেছন পেছন আমার সাথে
ঠিক এসেছিস কল্পনাতে,
অবাক চোখে চেয়ে -
ওরে অবুঝ মেয়ে ;
এমন করেই ঘিরে থাকিস
শ্রাবণধারা বেয়ে।
সেই যে কবে কালিদাস ও
এমনি করেই মেঘ পাঠাতো
তোর ঠাকুমার কাছে।
আমি নেহাৎ জানতে পেরে
সেই সেদিনের কথা -
ইচ্ছে করেই না জানিয়ে
পালিয়ে এলাম এতো দূরে,
দেখতে ব্যকুলতা !
কিন্তু এখন তোকে দেখে
বুঝতে পারি কালের স্রোতে-
আরো অনেক এগিয়ে গেছে
মনের আকুলতা।
তাই তো মেঘের সাথে উড়ে,
তুই এসেছিস এতো দূরে,
চোখের দেখায় খুঁজে নিবি
আমার শরীরখানা।
অনেক দিনের অপেক্ষা তাই
করতে নাচার, এ কালে চাই
এক্ষুনি সেই পাওয়া।
তাই তো আসা যাওয়া।
এবার তবে আয় না কাছে
লজ্জা ভেঙে স্পর্শ নে তুই
হাজার ভীড়ের মাঝে।
চুপটি করে চোখটি বুঁজে
গন্ধ নেব খুঁজে খুঁজে
সারা শরীর বেয়ে।
ওরে অবুঝ মেয়ে –

মেঘের আনাগোনার ফাঁকে
হাতখানা তোর নেব হাতে -
ম্যালে'র সে এক কোনে।
আবছা আলোয় মেঘ জড়িয়ে
ঠান্ডা হাওয়ার আমেজ নিয়ে
খুঁজবো ফাঁকা পথ।
পাকদন্ডীর ওঠা নামায় -
বৃষ্টি যদি আসে,
ছাতাখানা খুলে নেব
তুই তো তখন পাশে।
ছাতার নীচে তোর সে মুখে
চুমো খাবো মনের সুখে
মেঘ ভাসা সেই পথে।
বৃষ্টিভেজা নির্জনতায়
পাইনগাছের থেকে।
জল পড়বে,টুপ টুপ টুপ
ছাতার ছাদের 'পরে -
সেই আওয়াজে গভীর হয়ে
থাকবো অনেক সময় নিয়ে
খোলা আকাশ মাঝে।
দূরের পাহাড় মেঘের স্তরে
আড়াল দেবে দুইজনা'রে
করতে মনের খেলা।
এমন সকালবেলা।
কত দিনের পরে তোকে
পেলাম আবার মেঘমুলুকে
শহর থেকে দূরে -
এমন নিবিড় করে পাওয়া -
আমার যত নীরব চাওয়া,
তোর গভীরে নৌকো বাওয়া
নাচের সুরে সুরে,
জলভরা মেঘ থমকে দাঁড়ায়
তোকেই শুধু দেখে।
ধূপছায়া রঙ শাড়ির সাথে
ময়ূরকন্ঠী জামা -
পিঠের ওপর একঢাল চুল
লজ্জায় মুখ রাঙা।
তোর ওই লাজুক ঠোঁটের কোনে
একফোঁটা জল আপনমনে
কাঁপছে থরোথরো,
তাই তো আমি বাক্যহারা
স্থির হয়ে রয় চোখের তারা,
অমন কিছু দেখে।
বুকের ভেতর সুখের কাঁপন
দিচ্ছে হামাগুড়ি।
তোর ওই ঠোঁটের জলটা শুষে
আঁকবো ইচ্ছেঘুড়ি।
তারপরেতেই তুই হঠাৎ করে
আমার গালে ঘষে দিবি
তোর ওই ভেজা গাল। 
বৃষ্টি-ঝরা তোর ঐ গালে
মৃদু মৃদু হাওয়ার তালে
ঝরঝরিয়ে নামবে শ্রাবণ
বাজাতে ঝাঁপতাল।।

(১৯)

অনেকদিনের পরে—

আয়না এবার আমার কাছে—
অনেক দিন তো হল,
ইচ্ছেটাকে বইবি কতো
ঘাসের মাথায় জলের মতো
হাওয়ার দোলায় জল ঝরবেই
তুই না এখন মাত্র ষোলো।
বয়স আছে পাথর চাপা
বকুল-চাঁপার গন্ধে মাখা
হাওয়ায় হাওয়ায় বছর বাড়ে
আমরা এলোমেলো।
অঙ্ক নিয়ে করুক খেলা—
দিনদুপুরে, রাতের বেলা ;
তুই যে আমার চিরকালের
নদীর পারে, আলে’র ধারের
নতুন ভোরের আলো।
তোর বয়স না হয় ষোলো—
তাতে—
কার কি এসে গেল ?

আয় না ছুটে আমার পাশে
যেমন করে নীল আকাশে,
শরৎ মেঘের ওড়া।
ফিরোজা রঙ শাড়ি পড়ে
হাঁপিয়ে যাবি বারে বারে,
এত’ই কি তোর তাড়া ?
আমি অবাক—, দিশেহারা।
থাকিস তো এই একটুখানি—
তার মধ্যেই ধড়ফড়ানি,
কখন যাব কখন যাব বলে।
আরে—
সময় শুধু তার নিয়মেই চলে।
সেকি, ভাবার কথা হল ?
তুই না এখন ষোলো !
ছড়িয়ে পড়া গন্ধ যে তোর 
আমার ঘ্রাণে, মন যে বিভোর—
প্রাণভরা নিঃশ্বাসে।
কোমল ঘাসে ঘাসে,
তখন যে তোর কচি পায়ের
চলার শব্দ ভাসে।
ছুন্‌ ছুন্‌ ছুন্‌ পায়ের মলে
হাল্কা আওয়াজ খেলার ছলে


বয় যে বাদল খড়ের চালে,
তার সাথে সংগতে।
তোর গোপন চলার পথে।

চুপটি করে থাকবি বসে
আমারই ডান পাশে।
বকুল ফুল ও করবে খেলা 
তোর শ্বাসে প্রশ্বাসে,
বৃষ্টি ঝরা ঘাসে। 

তারপরে তুই দেখবি চেয়ে
আমার চোখের তারা—
আমি হবই— দিশেহারা
তোর 
মুখের বাহার দেখে।
দুঠোঁট ভরা লালচে রঙে
টোল পড়া গাল আপন মনে
করবে খেলা কতো !
দু-আঙুলে আলতো করে 
হাত বোলাবো গালের ‘পরে
নরম নরম ভিজে।
আমি তখন নিজে—
আমার দুঠোঁট দিয়ে
স্পর্শ দেব তোর দুঠোঁটে’র 
লালচে রঙ ছুঁয়ে।
ঠিক তখনই মাথার ওপর
হাজার হাজার বকুল, চাদর—
বিছিয়ে দেবে তোর সে কাল চুলে।
রাত নামবে দূরে। 
মিস্টি সুবাস ছড়িয়ে দিয়ে
আমরা দুজন ভাসব সুরে
একসাথে উল্লাসে।
চিরজীবন এম্‌নি করেই
থাকিস পাশে পাশে।

(২০)

আরাকু’তে আয় তুই


একবার ;
শুধু একবার, আয় চলে—।
আরাকু’র পথে তোর সাথে যেতে
সব কথা দেবো বলে।
শুধু একবার আয় চলে।

এক—
অজানা স্টেশনে তোকে নিয়ে আমি
ভাবছি নেমেই যাবো।
মেঘেরা যেখানে আকাশ ছূঁয়েছে
সেইখানে তোকে পাবো—
পুরোটা নতুন করে।
আমার মনের মাধুরী জড়িয়ে
আসবি আমার ঘরে,
পাহাড়ের এক ধারে।
যেথা—
ঝর্ণা বইবে পাশে।
কুর্চি ফুলের গন্ধ ছড়াবে
পাহাড়ের ঢালু ঘাসে।
অকারণ উল্লাসে—
বৃষ্টির মতো নেচে নেচে 
তুই, 
ধরবি আমার হাত।
আমি ও তখন তোর আবেশেই
চিৎকৃত ধারাপাত।

তোর, 
কমলা রঙের শাড়ি
সবুজ পাহাড়ে তুই যেন ফুল,
আমার জন্যে তোর খোলা চুল
মেঘলা আকাশ ভারী।
আমি—
জাপ্টে তোকে বুকে ;   
কাঙালের মতো সবটুকু তোর, 
শুষে নেব তাড়াতাড়ি।
লজ্জায় তোর মুখ—, 
ছদ্ম রাগের সুষমা লালিত ;
আমার চোখেতে সুখ।
আলগা আঁচল বুক থেকে স’রে স’রে,  
খুলে যাবে বারেবারে—
অযাচিত আবদারে। 
শুধু দেব চুমো তোর খোলা পিঠে
আকাশে ঝরবে রোদ— সোনা মিঠে,
পাহাড়ে পাহাড়ে রঙ্‌।

তুই তো তখন আমার দু-হাতে
জড়িয়ে থাকবি ছায়াতে আলো’তে
মেঘেরা উড়বে সুখে—
আমিও তখন,
তোর সারামুখে
এঁকে দেব বুনোফুল।
তোর সে কানের দুল—
লজ্জায় শুধু উঠবেই দুলে
ঘাসগুলো চারপাশে।
তুই তো তখন ঘাসে
যত বুনোফুল একসাথে মিশে
তোর খোলা চুলের পাশে।
শিহরিত নিশ্বাসে।


(২১)


এবার তোকে ধ’রে—

এমন করে ভুলেই গেলি ?
এবার তা’লে খুলেই বলি –
তোর সে চোখে দেখেছিলাম 
আমার সব্বোনাশ।
কেন ভুলে যাস ?
তোর বিহনে দুঃখ বাড়েই—
এ কথা তুই জানিস ভালই।
তাই কি এমন ভাব ? 
ওরে আমার সব্বোনাশী—,
তোর জন্যেই কাঁদি-হাসি
সেসব ভুলে গিয়ে –
দূরের থেকে ফিক্‌ফিকিয়ে
ফর্সা গালে রোদ ছিটিয়ে
মজা দেখিস তাই !
তোর সে ঠোঁটে চিমটে হাসি
জানিস আমি ভালবাসি
অবাক চোখে চেয়ে।
ওরে অবুঝ মেয়ে –
আর কতকাল সইব জ্বালা 
দেখবো কত ছলাকলা
নিত্যি নতুন তরো।
এমন করে আর কতো কাল
সংগোপনে করবি নাকাল
দিনরাত্তির মিলে ?
আমায় নিয়ে পুতুলখেলা 
করিস না আর হেলাফেলা
এমন তিলে তিলে। 

তার চেয়ে আয় কাছে বসে
আমার গায়ের পাশে ঘেঁষে
গান শোনা গুন্‌গুন্‌। 
সেই সুরেতে ভেসে ভেসে 
যাবোই আমি নিরুদ্দেশে
তোকে সঙ্গে নিয়ে।
দেখব তখন তোকে—
কেমন করে মজা দেখিস
অমন দূরের থেকে—।
জাপটে ধরে বুকের কাছে
দেখব তখন। কেমন নাচে ?
দুষ্টু চোখের তারা—।
দেখব কেমন ঠোঁটের কোনে
মিচ্‌কি হাসি অন্যমনে
কেমন করে আসে !
চুলগুলো সব মুঠোয় ধরে
গন্ধ নেব হঠাৎ করে,
কাটবে মনের জ্বর।
ওরে পাগল, তুই কি আমার পর ?
সেই যে কবে ছোট্টোবেলায়
তোর সাথে সেই পুতুলখেলায়—
এনে দিতাম যজ্ঞি ডুমুর
গাছের থেকে পেড়ে।
তারপরেতে কচুর ডাঁটা
কাটতে গিয়ে হাতের পাতা
উঠ’ত হয়ে লাল।
বল্‌, কি ছিল সেই কাল ?
রান্নাঘরের থেকে চুরি—
ছিল কত’ই বাহাদুরি
লুকিয়ে মায়ের কাছে।
ধরলে পরা মনে আছে ?
মা যেন না বকে পাছে—
বাবা এসে দিত আড়াল 
মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে ?
ওরে ডাগর মেয়ে !
সেসব কথা ভুলে গিয়ে
আমার থেকে স্বপ্ন নিয়ে
আমায় দেখাস ছল !
পাগলী এবার বল্‌
আমার কাছে আসবি কি না ?
আমায় ভালবাসবি কি না ?
আমার গালে ঘষবি কি না –
তোর ওই দুটো ঠোঁট ?
কতদিনের চাওয়া আমার
এবার সত্যি হোক। 





(২২)

আয় না তবে আজ—


আসবি নাকি আজকে তবে !
আয় না – । 
রাতের শেষে কথা হবে
অনেক অনেক বেশী।
বছর শেষের নিশি না হয়
তোকেই ধরে বাঁচি।
নতুন বছর আসছে যখন
ভোরবেলাটার আগে
তখন না হয় অনুরাগে
একটু দিলি আলো।
পার্ক স্ট্রীটের এই মধ্যরাতে
তুই হাঁটবি আমার সাথে
গা’য়ে গা’য়ে ঘেঁষে।
মাথায় শীতের টুপি
দেখতে গেলে খরচা আছে
এমনতরো ভাব।
আমি তো চুপচাপ !
কতোদিনের পরে তোকে 
দেখছি দুচোখ ভরে।
রাতের টুনি’র আলোর মালায়
জ্বলজ্বলে তো তোকেই মানায় 
লাল শাড়িতে বেশ।
তার ওপরে পশমী জামা
কি অপূর্ব রঙ !
একটা দুটো চুল উড়ছে 
তোর সে গলার পাশে।
মাঝে মাঝে একটু হেলে
দেখছি মাঝে মাঝে।
তোর সে খোঁপা ঢেকে আছে 
টুপীর আস্তরণে। 
আমি মনে মনে
কত রকম স্বপ্ন বুনে চলছি অকারণে।

বছর ঘুরে যাচ্ছে চলে
এখনো তুই আমায় ফেলে
থাকবি অত দূরে ?
আমি থাকবো কেমন করে ?
সারা বছর ধরে !
তোর আশাতেই বেঁচে থাকা
রোজই এমন ক’রে 
স্বপ্নমাখা ভোরে।
নতুন বছর আসুক না হয়
আমাদেরই মাঝে।
এমন সরল সাজে
থাকিস যেন চিরটাকাল
আমায় বুকে ধরে।
ভোর বেলাতে সূর্য যখন
আলো দিয়ে ভরে –
রাঙিয়ে দেবে পূবের আকাশ
তার সাথে তোর গাল।
আমি তখন মাতাল হয়ে
সেই সকালে উঠবো গেয়ে
থামিয়ে মহাকাল !

(২৩)

আয় না রে আজ রাতে...

আয় না রে আজ রাতে...
আদর ভরা সোহাগ নিয়ে
ভাসবো দু-জনাতে।
ওরে, আয় না রে আজ রাতে...।

চৈতি বাদল ঝরছে জোরে
সারাটা মন আকুল ক’রে
ভিজে ভিজে হাওয়া।
তাইতো তোকে চাওয়া !
সারাটা রাত না হয় হবে
বেসুরে গান গাওয়া।

এক মুঠো জুঁই রাখবো ঘরে
জলের ছিটে দিয়ে।
কয়েকখানা স্বর্ণচাঁপা
আনবো পেড়ে নিয়ে।
যদি থাকে পলাশ তলায়
কয়েকটা ফুল ছড়িয়ে হেলায়
আলতো হাতে তুলে এনে
রাখবো ঘরে তাও...
চৈতি হাওয়ায় আমরা দুজন
ময়ুরপঙ্খী নাও !
বেশী দেরী করিস নে রে
বৃষ্টি কখন যাবে ধরে
সে কি বলা যায় ?
তার চেয়ে তুই আমার ডাকে
ছুটেই চলে আয়।

আজকে পড়িস ধূপছায়া রঙ
কানে পলাশ-দুল
মালা আমি রাখবো গেঁথে
হবেই নাকো ভুল।
চতুর্দশীর চাঁদ খুঁজছে
একটু মেঘের ফাঁক।
দোলের আগের রাতে যেন
আলোয় ভরে যাক।
ফুলের সাজে সাজবি রে আজ
যতো পারিস ততো
বকুল ফুল কি লাগবে রে তোর 
সাজতে মনের মতো ?
দোলনচাঁপাও আনতে পারি
তোর জন্যে সব।
দোলের আগের এই রাতে’তে
বসন্ত উৎসব !

আয় না রে আজ রাতে...
ফুলে’র রঙে রঙ খেলবো
তুই, আমি আর সাথে—
টুপটুপ টুপ বৃষ্টিধারা ফোঁটায় ফোঁটায় ঝ’রে
আমার গন্ধ-মাখা ঘরে
জানলা দিয়ে ভিজে হাওয়া
জড়িয়ে এসে ধরে।
আমি তখন মগ্ন হয়ে
তোরই বুকে’র প’রে।
হাজার হাজার চুমো শুধু
ঘরেই ঘুরে ফেরে...


(২৪)

তোর সাথে আজ আড়ি –


পারছি না আর তোকে নিয়ে
এবার দেব ছুটি দিয়ে
    বুঝবি তখন ভারি।
এবার সত্যি হবে আড়ি।

কবে যেন এসেছিলি -
মনে আছে তোর ?
এবার করবো না আর জোর।
যা খুশী কর, যা চায় মনে
উড়ে বেড়াস, ঘুরে বেড়াস
যা ইচ্ছে তাই করে বেড়াস
শুধু দেখবো সংগোপনে
লুকিয়ে আড়াল থেকে।
অবাক করা চোখে।
তোর জন্যে পাহাড় আছে
নদী আছে সাগর আছে
ঝর্ণা আছে বন ও আছে -
আমার সেসব ফাঁকা।
কেন যে মন দিতে গেলাম
তোর আবেশে পাগল হলাম
সত্যি আমি যা তা।
দিন কেটে যায় মাস কেটে যায়
সকাল আসে রাতও ঘনায়
তবুও নেই দেখা।
শুধু -
আমিই থাকি একা !

মনে আমার রাগের আগুন
তোর জন্যেই সব।
আর কবে তুই বুঝবি শুনি
আমার কলরব !
যখন খুশী তখন আসিস
কিচ্ছু বলি না যে –
তার মানে কি একা থাকতে
সত্যি ভাল লাগে ?
ডাকলে পরে’ই তোর যাতায়াত
এমন কেন হবে !
আমার জন্যে একটুও কি
ভাবিস না আর তবে ?
পলাশ শিমূল কৃষ্ণচূড়ার 
রঙ ঝরেছে কবে _
বারে বারে তোকেই আমায়
বুঝিয়ে দিতে হবে ?
এমন কেন হবে ?
কেন হবে এমন ধারা
বর্ষা যে ঢের দেরী।
জানি আমি বর্ষা এলেই
তুই করবি বাড়াবাড়ি।

আজ কি তবে আসবি নাকি
সেই বাগানে তবে !
হাজার চাঁপা ফুটে উঠে
গন্ধ ছড়ায় হাওয়া
সেই গাছের’ই নীচে না হয়
অবাক চোখে চাওয়া।
আজকে পড়িস সেই শাড়িটা
গভীর ঘন নীল - 
আঁচল যখন উড়বে হাওয়ায়
বাগানটা ঝিলমিল।
তোর হাসিতে ভরবে কেবল
আমার সারা প্রাণ
সন্ধ্যে নামা নরম আলোয়
শুনবো পাখির গান।
তবেই আমি ভাঙতে পারি
তোর সাথে ওই আড়ি
চাঁপা গাছের তলায় নাহয়
করবো বাড়াবাড়ি।
হাজার চুমোয় ভরিয়ে দিয়ে
তোর সে হলুদ গালে
আবার হবে ভাব আমাদের
সন্ধ্যে নামার কালে।
তার পরে তুই চুমোয় চুমোয়
ভরিয়ে দিবি মুখ
এই তো আমার সত্যি চাওয়া
আমার স্বর্গসুখ।


(২৫)

আয় না রে তুই কুসুম কুসুম


আয় না রে তুই ঝাঁপিয়ে পড়ে
বুকের ওপর  -
এতোদিনের জমিয়ে রাখা
সবটা আদর
দিতেই পারিস -
দুহাত ভ'রে।
এই গরমে কৃষ্ণচূড়া আগুন লালে,
শুধুই বলে
আমি আছি তোদের যতো ভালবাসায়।
সবুজ পাতা আড়াল করে পাপড়ি খসা’ই
গাছের তলে।
লাল কমলায় ভরে ওঠে নীচের মাটি
পরিপাটি।
দুপুর বেলার শুকনো হাওয়া দেয় বুলিয়ে
অলস গরম এ বৈশাখে।
কতদিনের পরে তোকে
ডাকছি যে তাই
বুকের কাছে। 
গ্রীষ্ম আঁচে -
উথাল পাথাল সারাটা দিন।
তোকে ছাড়া কেমন যেন
মন ভরে না। 
আর কতোদিন একা একা থাকবো ওরে,
বলতে পারিস ?
বলতে পারিস, কৃষ্ণচূড়া ফুটলে প'রে -
মনটা ফোটে আগুন তাপে
কেমন করে ?
বুকের ভেতর তোর সে ছবি
জ্বলজ্বলে চোখ, মিষ্টি চাওয়া
ঠোঁটের কাঁপন,চমকে দেওয়া
বেগনি শাড়ি হাওয়ায় ওড়ে
বুকের মাঝে।
সারা দুপুর তোকেই ভেবে –
গরম হাওয়া মুখে চোখে।
বেশ করেছি –
তোকেই নিয়ে স্বপ্নে আমার
ঘর বেঁধেছি –।
বেশ করেছি-  তোকেই ভেবে
বকুল তলায় চোখ বুঁজেছি –
এই গরমে !
কতো বকুল ঝরে গেল বুকের ওপর
সারা দুপুর।
ঝমঝমিয়ে – আলতো করে –
ঠিক যেমনি তুই যখনি
ঠোঁটটা ছোঁয়াস আমার গালে,
দিন দুপুরে—।
দোয়েল তখন লজ্জা পেয়ে
ডেকে ওঠে মিষ্টি সুরে।
ঠিক তেমনি –
আমিও তখন মুগ্ধ হৃদয়
তোর আবেশে।
কাঁধের থেকে বেগনি আঁচল
পড়ছে খসে – 
আমার কাঁধে।
স্পর্শ তারই একটুখানি
মন ভরানো দুপুর রোদে।
গনগনিয়ে রোদের তাপে
আমরা দু-জন ভালবাসায়
ইচ্ছে সাগর।
মন দু-জনের কুসুম কুসুম
হাল্কা লালে বকুল ছায়ায়
রোদ প’ড়ে যায় বিকেল গেলে।
ঠিক তখনি তোর সে তাড়া
আমার জীবন ছন্নছাড়া
করেই দিবি এমনি করে।
আবার কবে আসবি শুনি –
আমার পাশে !
এই যে যাবি, ভুলেই যাবি
আমার কথা।
ব্যকুলতা 
শুধুই আমার থাকবে শুধু
সারা জীবন।



*******

Comments