আমার কবিতা - ৮


আসিফা

 

একটি ৮ বছর বয়সী কাশ্মীরি বাচ্ছাকে সাতদিন ধরে জম্মুর একটি মন্দিরে আটকে রেখে ধর্ষণ করে তারপর খুন করা হয়।। পুলিশের চার্জশিটে ডিটেলস গুলো পড়তে পারলাম না এতটা বিবমিষা আর অস্বস্তি লাগলো।

মনে রাখবেন, ব্যাপারটা হয়েছে মন্দিরে। আপনাদের ঈশ্বরও বোধহয় ৮ বছরের শিশুটির ধর্ষণ দৃশ্য বেশ উপভোগ করেছেন। নেক্সটবার মন্দির যাবার সময় মনে রাখবেন এটা। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি সেই ইহুদীর মত এই শিশুটিও হয়তো তার ছিন্নভিন্ন যোনির রক্ত দিয়ে লিখে রেখে যাবে, "ইফ দেয়ার ইজ আ গড, হি হ্যাজ টু আস্ক ফর মাই ফরগিভনেস"!

আর হ্যাঁ, ধর্ষকরা হিন্দু এবং বাচ্ছাটি মুসলিম। স্বাভাবিক ভাবেই কিছু হিন্দু আইনজীবি এবং একজন বিজেপি এমএলএ ধর্ষকের সমর্থনে রাস্তায় নেমেছে। আবার ভেবে দেখুন। ৮ বছরের একটা বাচ্ছা মেয়ে, সাতদিন ধরে টানা রেপ। এরকম অপরাধও জাস্টিফায়েড শুধু অপরাধী ধর্মে হিন্দু বলে, আর ধর্ষিতা শিশুটি মুসলিম বলে।

  

আসিফা, তুইতো শুধুই একটা যোনি
কি করবি বল ওরে ও মিস্টি মেয়ে
ভূস্বর্গে তোর মন্দির দেখা হলো
রক্ত গড়াল ঢালু মেঝেখানা বেয়ে
 
যোনি-র মানেটা এখনো বুঝিসনি তো
ওরা বুঝেছিল তার স্বাদ, তোকে চিরে
একদিন নয়, টানা সাত দিন ধরে
জাপ্টে চটকে ফেল্‌লোই তোকে মেরে
 
মরে বেঁচে গেলি এইটুকু জেনে রাখ্‌
দুদিন বাদেই ভুলে যাবে তোকে সব
জানিনা রে আমি, শহীদ কাদের বলে !
মোমবাতি হাতে আসবেই বিপ্লব ! 
 
©গৌতমদত্ত
১২ই এপ্রিল, ২০১৮
কলকাতা
 

#

 

চৈত্র                                                      
 
বছর ও তো ঘুরে যাবে
নিশ্চিন্ত নিয়মে।
বদলাবে বিশ্বাস নতুন পাতায় পাতায়।
লাল নীল সবুজ হলদে রঙ মেখে
ফুলগুলো ফুটে যাবে
নিয়মমাফিক।
গাছের গোড়ায় সার জল হাড়গুঁড়ো।
নীচে থাকা শেকড়বাকড় - 
ঠিক বেছে নেবে জৈব আর অজৈব
দৃষ্টিকটূ সহাবস্থান। আর আমরাও
দেখে নেবো আমের বউল শোভা।
কচি পাতায় আকন্দ ধুতুরা -
অবহেলে বেড়ে ওঠা লকলকে গাছ
 
বুকের ভেতরে স্খলিত বিশ্বাস।
চোখের ভেতরে অজস্র সিল্যুয়েট।
মনের ভেতরে দিগন্তবিস্তৃত গোবি।
 
মাধ্যাকর্ষণ টেনে রাখে দুপায়ে
ভর করে সবটুকু স্বাদ...
 
©গৌতমদত্ত
৯ই এপ্রিল, ২০১৮
কলকাতা
 
 
#
 
 
অঙ্গীকার -                                                 
 
আজ একটা কবিতা লেখার কথা ছিল
একজনকে কোথাও দিয়েছিলাম
কিন্তু পারলাম না
 
নিজের হাতে লাগানো গাছে যখন
প্রথম কুঁড়ি এল
কেউ তা ছিঁড়ে দিয়েছিল
আরো অনেক কুঁড়ির আশায়
কিন্তু আমি...
 
প্রথম সবকিছুর শিহরণ
পরে আর হয় নাকি ?
ল অফ ডিমিনিশিং রিটার্নস
সেই কবে বলে গেছে কেইন্স সাহেব
 
কিন্তু কবিতাটা ?
ধরে নিও সেটা ওই প্রথম কুঁড়ির মতো
কেউছিঁড়ে নিল
আরো অনেক কবিতা লেখা হবে বলে
কিন্তু আমি...
 
তুমি উপলক্ষ মাত্র
 
©গৌতমদত্ত
৩০শে মার্চ, ২০১৮ 
(আমার সৃজন বইমেলা সংখ্যায় প্রকাশিত)
 
#
 
গলার স্বরে আমার বুকে কাঁপন ওঠে
বর্ণমালা ঢেউ খেলে যায় শরীর জুড়ে
তখন আমি বকুল ফোটা দেখতে থাকি
ধানী রঙের একটা ছবি পালায় দূরে।
ধরতে গেলেই স্বপ্ন ভাঙে মনের কোনে
গলার তাপে শিথিল শরীর লজ্জাবতী
বিরামবিহীন শব্দ খেলা নিশীথ জোড়া
মুখের ওপর আলোর রেখা চন্দ্রজ্যোতি।
কৃপণ তুমি মনের ঈথার লুকোচুরি
সহজ করে কথামালা আবেগ বিধুর
শালিক শরীর আলুথালু জলের খোঁজে
মনের ভেতর বিহ্বলতা রম্যমধুর।
 
©গৌতমদত্ত
২৭শে মার্চ, ২০১৮ 
 
 
#

 

কলকাতা -                               
 
 
সবকিছু ছুঁয়ে ছেনে পাই নাকো আর
হে আমার কলকাতা শহর।
ছোটোবেলার মতো তুমিও ধূসর...
ময়দানে একটাও গাছ নেই আর, যাকে
পাঁচ-ছ জন বন্ধু মিলে জড়িয়ে ধরে
হুল্লোড় করতে পারি !
ধর্মতলায় সেই বড় কেটলির চা
গড়িয়ে পড়ছে পোর্সিলিনের পেয়ালায়
ট্যাক্সি থেকে উৎসুক চোখ
পলকহীন, অবাক, বিস্ময়।
কালো-হলুদ ট্যাক্সিও সর্দারজীদের হারিয়ে
শুধুই হলুদ হয়ে ধরা ছোঁয়ার বাইরে আজকাল।
 
আধোঘুমে মাঝেসাজেই মা-বাবার বাড়ি ফেরা
গোধূলিবেলার নাইট শো
টং টং করে রাতের ট্রাম ফিরিয়ে দিত বাবা মাকে।
 
জলের তোড়ে স্কুল যাওয়া
সেই সব দিন।
 
মধ্যবিত্ত জীবন এখন
লাস ভেগাস ধরবে বলে
মাঞ্জা দিচ্ছে চাইনিজ্‌ সূতোয়।
দৌড়চ্ছে কলকাতা
সবুজ থেকে নীলে...
আরো নীল নীল হয়ে সাদাকালো ফ্রেম।
রিটাচের অপেক্ষায়...
 
©গৌতমদত্ত
২৬শে জানুয়ারী, ২০১৮
(কিঞ্জল পত্রিকার তিন-ছয়-নয় সংখ্যার জন্যে) 
 
#
 
 
আবেশ                                
 
 
কথার ভাঁজে আমায় তুমিই মারতে পারো
মনের খেয়ায় পাল তুলে দাও যত্ন করে
নদী এখন দুপুর বেলায় বইছে বেগে
রেখা আঁকায় সাগর সেতো অনেক দূরের
 
ভরন্ত রোদ দুধার চলে সবুজ শ্যামল
থেকে থেকে শীতের হাওয়া ঝলক লাগায়
মন উচাটন বহু দিনের নৌকো বাওয়া
পিছুটানে এপার ওপার মনটা হারায়।
 
এমনি সেদিন অচিনপুরে স্রোতের টানে
দুখানি পাল মাঝদুপুরেই আকাশ জুড়ে
উড়লো হঠাৎ শন্‌শনিয়ে দিক ভুলিয়ে
তারপরেতেই কাটলো কদিন সপ্তসুরে।
 
শুরু হলেই শেষটা ভাবা পাগল প্রলাপ
জীবন চলে জীবনেরই প্রণয় পাশায়
নৌকো যেমন মাঝির হাতেই অবলীলায়
ভেসেই চলে হিসেব মেপে স্রোতের আশায়।
 
তেমন করেই আমরা যদি ভেসেই থাকি
কোন সে মাঝি পথ দেখাবে মনের ভেতর
ইচ্ছেনদী ইচ্ছেমনে অঙ্ক কষেই
বাছবে জীবন অবিরত    আনবেই ভোর।
 
এমন করেই কচি পাতা ঠিক খুঁজে নেয়
আকাশ আলো জলের ধারায় অবাক চোখে
এমন করেই জীবন বাঁচে জীবন সেঁচে
কথার ফিকির যতই খেলাও দুর্বিপাকে। 
 
এমন করেই দেখবো আমি নতুন আলো
তোমার চোখেই পদ্মপাতার চিকন ছটা
তোমার কাছেই ভোর শিখবে বাঁচতে শেখা
তোমার বুকেই রাত দেখবে তারার ফোটা।
 
©গৌতমদত্ত
১৯শে মার্চ, ২০১৮
(সৃজন পত্রিকার আগামী মুদ্রিত সংখ্যার জন্যে)
 
 
#
 
যাদুকর -                        
 
 
কতোদিন বলো আড়ালে রাখবো মুখ
মন জুড়ে শুধু উপোসী বাঘের শ্বাস
অথচ কেন যে বলতে পারিনা মুখে
আসঙ্গ খোঁজে রোজ নব উদ্ভাস
 
মনে জেগে থাকে স্পর্শ পীড়িত সুধা
দ্রিম দ্রিম বোল রক্তের সাথে মেশে
চোখ বুঁজে ছবি উদ্দাম অবিকল
তারি খাঁজে খাঁজে মন ধায় অক্লেশে। 
 
শিল্পী নিপুন ছেনি খুদে খুদে গাঁথে
পদ্মপাপড়ি মঞ্জিমা ঢলোঢলো
উপসংহারে প্রাণ পায় সুতনুকা
মানুষ তো ছার পাগলেও টলোমলো।
 
অবচেতনের তল পাওয়া দুষ্কর
দৃষ্টি হানায় উন্মাদ উপশিরা
আগ্নেয়গিরি খোঁজে পথ অবিরত
লাভার জোয়ারে দিকহারামুখচোরা।
 
যাদুকরী ছল উত্তাল বাঙ্ময়
ঠোঁটের কোনায় বিজয়ীর ক্রুর হাসি
অজগরপাকে শঙ্খলাগানো হ্লাদ
কোথায় পালাবি ওরে ও সর্ব্বনাশী।
 
তন্ত্র-মন্ত্র বেদ থেকে শুরু করে
আধুনিকতার জটিল কুটিল গেরো
সব কিছু আমি ছুঁয়ে গেছি অকাতরে
ক্ষণে ক্ষণে বুঝি উত্তাপ শরীরেরও।
 
শিল্পীর মতো নিপুণ তুলির টানে
প্রাণ এনে দেবো আসঙ্গ আশ্লেষে
ধুকপুকে এক শাণিত শরীর ঘিরে
বাটালীর ধার ক্ষয়ে যাবে অক্লেশে।
 
এমন করেই যাপিত জীবন বোধ
নব নব রূপেঘোলাটে দৃষ্টি দিয়ে
ছেনে নেবো আমি গোটা পাখনার রঙ
যাদুকর আমি, প্রজাপতি ডানা ছুঁয়ে।
 
©গৌতমদত্ত
২০শে মার্চ, ২০১৮
(আঁতুড়ঘর পত্রিকার আগামী মুদ্রিত সংখ্যার জন্যে)
 
 

#

তোমার হাতে হাত রেখে আজ বলতে পারি
আজকে তুমি হাত বাড়াবেই জোয়ার টানে
স্বপ্নগুলো গাঁদাফুলের পাপড়ি হাজার
ইচ্ছেমনের পাল তুলেছি উজান গাঙে।
এমন দিনেই সব পেয়েছির দেশে এসে
তোমায় জুড়ে রঙবেরঙি হাজার ফানুস
উড়ছে হাওয়ায় দামাল হয়ে চতুর্দিকে
অবাক চোখে খুঁজছি আমি মনের মানুষ
 
©গৌতমদত্ত
৯ই এপ্রিল, ২০১৮
 
 
#
 
 
ভোর হয়            
 
রাত আর বেশি বাকি নেই...
এইবেলা সেরে নিই অনঙ্গ বিলাস।
ভোর হয় গেলে পরে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে যাবে।
তার চেয়ে এই বেশ -
প্রকৃষ্ট সময়।
 
পাখীরাও জাগে নি এখনো...
চরাচর নির্মম স্থবির।
এইবারে জানু পেতে অধিকার নেবো শুধু
আজন্ম ইচ্ছার...
সবকিছু তছনছ করে উন্মাদ শরীর দিয়ে
বাজাবোই সাদা শাঁখ।
যতোখানি দম আছে
যতোখানি জোর -
সবকিছু জড়ো করে হাতীর শুঁড়ের মতো
আশ্লেষে জড়িয়ে তোমায়
নিপুন সেলাই বারংবার...
 
শীৎকারে ভোর হবে -
রাত যাবে ভিজে।
অপরূপ মায়াময় এ দুটো শরীর...
লাল লাল আলতার পায়ে পায়ে
শঙ্খলাগা ভোর...
 
©গৌতমদত্ত
১৯শে ফেব্রুয়ারী, ২০১৮
(শনিবারের আসর পত্রিকার মুদ্রিত সংখ্যার জন্য ০৪/০৪/২০১৮)
 
 
#
 
 
সুজাতা-                                                    
 
শীতের দুপুরে একদিন
নদী আমার সাথে কথা বললো...।
 
মনটা ভার ছিল সেদিন
একাদশীর চাঁদের মতই।
তাই গম-রঙা রোদ পিঠে মাখিয়ে
একাই বসে ছিলাম নদীর ধারে।
 
হঠাৎ নদী যেন কানে কানে এসে বললো, শুনলাম
তুমি যা চাইছো, আমি যে তাই গো...
আমি বললাম, কি ?
নদী বললো, জানি কবি, তুমি একটা কবিতা চাইছো,
         অনেকদিন কবিতা আসে নি যে আমি জানি...
বললাম, না, কবিতা নয়। আমি চাইছি একটা নরম আশ্রয়
         সেই চালধোয়া স্নিগ্ধ হাত...
নদী বললো, আমারো আছে তাই...
আমি বললাম, সে রূপকে আছে, আমি সত্যিসত্যি চাই...
নদী হেসে উঠলো। বললো, তাই বুঝি ? আচ্ছা বেশ...
 
শীতের শান্ত নদী হঠাৎ করেই চঞ্চল হলো।
ঢেউয়ের দোলা রোদের চিকমিক ছল চলাৎ শব্দ
নুপূর পায়ে নদী এগিয়ে এলো আমার কাছেই
আমার পাদুটো ভিজিয়ে দিয়ে বললে
কি গো,  পাচ্ছো আমার স্পর্শ ? কি মনে হচ্ছে ?
হ্যাঁ পাচ্ছি।
নদী বললো, কেমন তা...
মনে হচ্ছে সুজাতা এসে আমার পা ধুইয়ে দিয়ে বলছে
তোমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে কবি, আমি পায়েস এনেছি...
 
 
©গৌতমদত্ত
৭ই জানুয়ারী, ২০১৮
        
 
 
#
 
গোপন সানাই                                          
 
দূরের থেকে দেখছি তোমার ফিরে যাওয়া
আর কিছুখন পেতাম যদি তোমায় কাছে
ফুল ফোটাতাম সারা আকাশ অবাক মায়ায়
খঞ্জনা ঠিক বসতো এসে আমার পাশে
 
ফিরে গেলেই আবার তুমি পলতালতায়
জড়িয়ে থাকো সবুজ পাতায় বেড়ার সাথে
আমি তখন খুঁজেই চলি অবুঝ খোঁজায়
তুমি তখন ব্যস্ত জীবন ফলের আশায়
 
দূর বেড়ে যায় তোমার আমার মধ্যিখানে
চোখের নজর ঝাপসা থেকে ঝাপসাতর
পলে পলে হারাই তোমায় স্পর্শ মধুর
রক্তে আমার তোমার চলন সর্বনাশা
 
জীবন যখন তোমার নিয়ে দ্বন্দমধুর
শবনমেরই আলোর ছটায় মুক্তো হাসে
আমি তখন হাত বাড়িয়ে তোমায় নিয়েই
ট্রাপিজ্‌ রিং-এর দোলাচলে সবুজ ঘাসে
 
জীবনমরণ যোগবিয়োগে সাপের লুডো
সিঁড়ি পেলেই তোমার মুখে ফল্গুধারা
আমি তখন দুহাত তুলে জগাই মাধাই
বুক পেতেছি ভালবাসার গোপন সানাই।
 
@গৌতম দত্ত
২৭শে ডিসেম্বর, ২০১৭
 
 
#
 
 
প্রেম দাও                                      
 
তুমি নেই বলে
একটাও পাখি নেই  ধর্মতলায়।
শুধু লেনিন আর বাংলার বাঘ এই দুজনে
দাঁড়িয়ে আছেন এই শীতের রোদে।
কার্জন পার্কের কোনে সেই ইঁদুরগুলো
কোথায় যে পালিয়েছে
দেখি না এখন আর।
স্টেটসম্যান হাউসের সামনে আমি বসে আছি
এক বুক অপেক্ষায়
তুমি আসবে বলে...
 
অনেক প্ল্যান করেছি হপ্তাভোর।
তোমায় নিয়ে হেঁটে যাবো কার্জন পার্কের
পাশ দিয়ে। তারপর রেড রোড ছুঁয়ে
রানীর বাগান ঘেরা প্রাসাদে পৌঁছে যাবো।
জারুলের তলা আর দু-জোড়া চোখে
মেখে নিয়ে বিকেলের আলো
সন্ধ্যে নামাবো হুগলী ব্রীজের চূড়ো থেকে।
ঘন থেকে আরো ঘন হয়ে আবছা আলোয়
ঠোঁটদুটো ঘষে দেবো অন্য দুটো ঠোঁটে।
তারপর বিশ্রাম শুধু...
চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা ঘাসবিছানায়
মুখের ওপর আরেকটা মুখ মেখে...
 
কলকাতা বুড়ো হয়ে গেছে।
স্বপ্ন দেখা ভুলে গিয়ে বড় অন্যমনস্ক আজকাল
দাবী আছে     প্রত্যয় নেই
মিছিল আছে   সংগ্রাম নেই
রোগ আছে     নিরাময় নেই
প্রেম আছে     ভালবাসা নেই।
 
এক চুমুক ভালবাসার জন্যে
শহর মুখিয়ে আছে
আমিও...
 
@গৌতম দত্ত
১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৭
 
 
#
 
 
একমুঠো হাত ধরবো বলে হাত বাড়ালাম
বাড়িয়ে দিলে দু-খানা হাত আমার মুঠোয়
আমি তখন পাগল হাওয়া ঘর হারালাম
বুকের ভেতর দামাল ঝড়ে জোয়ার ভাঁটায়।
 
তখন তুমি উদ্ধত এক কৃষ্ণচূড়া
পৌষ মাসেই আবীর নিয়ে খেলতে পারো
তোমার চোখে চোখ রাখতেই পাগলাঝোরা
উতল ফেনায় ঝাঁপিয়ে এসে মন ভরালো।
 
এমন করেই দিনবদলের স্বপ্ন এনো
তোমার হাতেই কলস ভরা স্নিগ্ধ জলে
উপোষী মন উড়ুক তবে পাখনা মেলে
দেখবো তোমায় নিত্যনতুন কৌতুহলে...
 
 
@গৌতম দত্ত
১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৭

 

#

 

তুমিই বলো...         
 
তোমার জন্যে আনতে পারি একটা সাগর
তুমিই শুধু আটকে রাখো একটা পুকুর
তোমার জন্যে পাড়ি দেব ইউরেনাসে
যদি তুমি দেখাও আমায় বুড়ো আঙুল
একটি বারও...
 
তোমায় নিয়ে যা-ইচ্ছে তাই করতে পারি
যুঁই গাছেতে যুঁই ফুটিয়ে আনতে পারি
শীতের বেলায় অকাল জলে ভিজতে পারি
উধাও হয়ে তোমায় নিয়ে এক জালা মদ গিলতে পারি
চুন-হলুদে সারা শরীর মাখতে পারি সুখের তাপে
হাজারটি বার...
 
তোমার জন্যে লিখতে পারি বারো নম্বর বাঁধাই খাতা
ভর্তি করে
পড়তে পারি সব কবিতা আমার ভাষায় আমার গলায়
মনের জোরে
আঁকতে পারি পাহাড় সাগর একটা ফোটা আস্ত গোলাপ
নানান রঙে
গাইতে পারি সব ধরনের সব কিছু গান
নিজের সুরে আমার মতো
আর কিছু কি থাকলো বাকি তোমায় দিতে ?
 
তুমিই বলো সত্যি করে
আমার জন্যে একফোঁটা মেঘ পারবে দিতে ?
তুমিই বলো...
 
@গৌতম দত্ত
১০ই ডিসেম্বর, ২০১৭
 
 
#
 
ফোন                                                    
 
একখানা ফোন এলে
আমার বাগানে যুঁইফুল ফোটে
একখানা ফোন এলে
লণ্ডভণ্ড সময়
দিন রাত ভুল হয়ে যায়
একখানা ফোন এলে -
 
মেঘে মেঘে ফোন উড়ে যায়
আজকাল
রামগিরি থেকে কলকাতা
পলকে পলক।
 
একখানা ফোন এলে
কলকাতা থেমে যায়
গোলাপি আভায়।
শুধু এই একখানা ফোনের জন্যেই
তুমি বেঁচে আছো, কলকাতা
ভিক্টোরিয়ার বাগান।
এই একখানা ফোন এলে
আমিও বাঁচতে পারি...
 
@গৌতম দত্ত
২৭শে নভেম্বর, ২০১৭
 
 
#
 
স্ট্যাচু -
 
একবার হাত ছুঁয়ে দেখো
আমি বেঁচে আছি কি না ...
আঙুলের অসাড়তা
আর মননের পাংচারে একমাত্র তুমিই আছো
জেগে...
বাকি সব উইপোকা খেয়ে যায় অদ্ভুত আঁধারে।
 
একবার চেষ্টা করে দেখো
অসাড় আঙুলগুলো নিয়ে খেলা করে
হলদে সিগন্যালের মতো লুপ্ত রক্তে আজ
দুটো রঙ...আঙুলে মেখেছে আজ
শুধু -
জ্বলে আর নেভে
নেভে আর জ্বলে তামাম শহরে।
 
একবার চুমু দাও অসাড় আঙুলে
মুঠো করে ধরে নিতে দাও
তোমার চাঁপার কলি এ সভ্য শহরে-
ছানি পড়া হাতদুটো তোমার দুহাতে ধরে নিয়ে
একবার তুলে দেখো
এ শহরে হাত মুঠো করে সেই
ভঙ্গী এনে দিতে পারে কি না
তোমার আদর... আর
লিপস্টিক ছাপ
 
©গৌতমদত্ত
১৫ই নভেম্বর, ২০১৭
 
 
#

 

একটা রাত দেবে আমায়
তোমার স্পর্শ মেখে একখানা
কবিতা লিখব তাহলে...
দেবে ?

একটা গোটা রাত চাই
তোমার সবটুকু স্পর্শ পেতে।
ভাঙারাতে জোয়ার আসে না কবিতার শরীরে
মন শুধু শব্দ শোনে উত্তুঙ্গ মাস্তুলে
বন্দরে দাঁড়ের শব্দ ছপছপ ছপছপ
গলে যায় সোনামন নৌকোর খোলে।

একখানা পুরো রাত আর
সারারাত স্পর্শের হিন্দোল
একখানা কবিতা আর
সারাটা শরীরঘ্রাণ মেখে নেবো
দশটা আঙুলে....

 
©গৌতমদত্ত
১৩ই নভেম্বর, ২০১৭

 

# 

 

লোনাস্বাদ-
 
লোনা হাওয়া চারদিকে
জল লোনা বালি লোনা
লোনাময় হয়ে আছি সাগরের ধারে এসে
 
ঠোঁটের নোনতা স্বাদ কিম্বা ঘামের
ছুঁয়ে যায় মনে মনে
অবিরত ঢেউ ঝাঁপ
চোখের পেছনে আর
নরম চাদরে
 
মন মনে রাখে কতোকিছু
সেই ইছাপুর সেই নবাবগঞ্জ
সেই ছুটে যাওয়া গতি
আর লোনা চোখজলে
ফের ফিরে আসা
চার্নকের পাশে।
 
#
©গৌতমদত্ত
৮ই নভেম্বর,২০১৭
পুরী
 
#
 
 
হ্যালো
 
একটু সময় নিয়ে
একবার হ্যালো বলো
মুঠোফোনে...
স্থির হয়ে যাবো তোমার গলার উত্তাপে
তোমার তারে ভাসা স্বর
একশো এটম বোমের চেয়েও উষ্ণ
হয়তো আরো বেশী...
 
গ্রাহাম এর কাছে ঋণ রয়ে গেল।
 
ঋণী হয়ে আছি বহুকাল...
বহুকিছু
তারে ভেসে ছুঁয়ে দিতে পারি তোমার
দু-গাল...
 
 
©গৌতমদত্ত
৭ই নভেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা।
 
 
#
 
 
ভড়ং
 
অতল আকাশের গহন কালো রঙ
দেখতে চাই সোনা ব্যাঙের গায়ে
তাতে যদি বংশরক্ষা হয় !
এবারে কালো চাল আসছে বাজারে...
 
বোশেখ দুপুরের পীচগলা রাস্তায়
ডাবল্‌ডেকার কবে শেষ দেখেছি
তা আর মনেও পড়ে না...
পাদানির ঘষ্‌টানির মতো হেলে যাওয়া বুকের
ধুকপুকুনির আওয়াজ মনে হয় পীচরাস্তায়
কান পাতলে এখনো শোনা যাবে।
কিন্তু রাস্তা যে আর ফাঁকাই হয় না
কান পাতি কখন ?
 
দিনেদুপুরেই দেখি
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ পালা
শহরের মোড়ে মোড়ে
চোখ ঠিক বুঝে নিতে জানে
স্বর আর ব্যঞ্জন বর্ণের তফাৎ।
চড়ুই কমে যায় মোবাইল টাওয়ারের নামে...
এও এক উপরি পাওনা।
 
©গৌতমদত্ত
৩রা নভেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা।
 
 
#
 
 
মানিক      
 
সেই যে কবে আবোল তাবোল মনের মাঝে গেঁথে
হুল ফুটিয়ে চলছে রোজই নানান সুরে মেতে
উপেনকিশোর সুকুমারের প্রজন্মপথ বেয়ে
সত্যজিতের সোনার কলম চল্‌লো বেগে ধেয়ে
 
মনের কোনায় আবোল তাবোল
বুকের ভেতর টুনটুনি
চোখের ওপর ছবির সুরেই
গুগাবাবার গান শুনি।
 
বালক থেকে বদ্যিবুড়ো ফেলুদাতে মগ্ন সবাই  
সেপ্টোপাসের বর্ণনাতে শিউরে ওঠা যাচ্ছেতাই
বঙ্কুবাবু আছেন জানি, চাবি হারায় সমাদ্দারে-
লালমোহনের হিন্দী বলা এক্কেরে রঙবাহারে।
 
ছফুটের ওই মানিকবাবুর
খেরোর খাতা বর্ণময়
লেখা আঁকা খসড়া সবই
ওই খানেতে জড়ো হয়।
 
এমন করেই পথ চলেছে পাঁচালী ও অস্কারে
এমন করেই ছবি আঁকে চারুলতা অন্তরে
এমন করেই গুপীবাঘা রাজার মনে সুখ আনে
এমন করেই বাবলু বোঝে কূপমণ্ডুক মানে। 
 
ফেলুদাতো থাকবে বেঁচে পাতায়
পাতায় অনেকদিনই
যেমন আছেন সুকুমার আর
পাগলা দাশু বিরামহীন।
 
 
( কিঞ্জল পত্রিকার সত্যজিত সংখ্যার জন্য)
 
 
#

 
 
পার্ক স্ট্রীটে                  
 
কতোদিন পরে
তোমার মুঠোয় হাত -
সব পংক্তিই লেখা হয়
ঘুরেফিরে
শব্দের পরে শব্দের ধারাপাত
 
আজ পার্ক স্ট্রীট 
মখমলে মোড়া ছবি
দুমুখো সুরেই গাড়িঘোড়া চলাফেরা
স্বপ্ন দেখেছি কতো দিন ঘুরে ফিরে
ট্রাম্পেট সুরে ম্যুলা রোজ চল্‌কায়
 
আজ দেখাবোই গালিবের ছোঁয়া পথ
আমি জানি তুমি চমকে উঠবে জেনে
কলকাতাবাসী বাসী করে দেয় সব
নিত্যনতুন চক্‌মকি গেঁথে গুনে
 
হাতে হাত ধরে বসবো কাঁচের ধারে
ফ্লুরিজেতে বসে আবার আলাপ হবে
টুংটাং পেয়ালায় বৈকালবৈভব
ফোয়ারা ছোটাবো দুজনেই    অনুভবে
 
বাইরে তখন হেমন্ত দেবে ডাক
শ্রাবণ নামবে কার্তিক সন্ধ্যায়
তোমার লতিতে জড়োয়ার সৌরভ
মায়ামুকুলিত পার্কস্ট্রীট ছটা পায়
 
সন্ধ্যে ঘিরছে টেরিজাকে
গায়ে মেখে
হ্যালোজেন আজ উদ্ধত সারিগান
সময় ফুরোয়
নিত্য রুটিন মেপে
চারচোখ জুড়ে অভিকর্ষের টান
শিকড় খুঁজছে উর্বর পলিমাটি
গভীরে যেমন স্তরে স্তর খেলা করে
মেট্রোর সিঁড়ি পাতালে গিয়েছে নেমে
সন্ধ্যে জুড়োয় আমাদের অগোচরে
 
©গৌতমদত্ত
৩১শে অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
(ঋতুযানএর২০১৮ কবিতা সংকলনে প্রকাশিত)
 
 
#
 
ফুটপাথ -                                 
 
মাঝে মাঝে চারচৌকো টেবিল
ভালোবাসায় গোল হয়ে যায়...
প্রজাপতি চক্কর আর
অপলক দৃষ্টিবিনিময়
 
গড়িয়াহাটের ফুটপাথ ও
রানওয়ে হয়ে ওঠে...
জোড়া হাত   আঙুলে আঙুল
ছিটকে লাগা গোলাপজলে
শরীরে শরীর
 
চেনা ছবি অচেনা হয়
স্বপ্নের সাগরবেলায় রোদ
নিঃস্পন্দ নির্জন চারদিক
কল্লোলিনী জমা করে ফুল
দুজন হাঁটবে বলে...
 
প্রেম অবিরত আকাট  ফুটপাথও
কবি বদল করে মধ্যরাতে
বগলে বোতল আর একবুক প্রেম
কলকাতা ডায়েরি লেখে
অবিনাশ সুষমায়...
দুই ঠোঁট মিশে যায়
টেবিলে সিঁড়িতে রেস্তোরাঁয়
 
 
©গৌতমদত্ত
২৮শে অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
(ঋতুযানএর২০১৮ কবিতা সংকলনে প্রকাশিত)
 
 
 
#
 
ভাবনায়                      
 
বিকেল হলেই বৃক্ষছায়া দীর্ঘতর
উঠোন জুড়ে ভালোবাসার কল্পবেড়া
বিকেল মানে মনগহনে বৃষ্টি নামা
ঠিক তখনি আকাশভরা ঘরে ফেরা
 
চোখের ভাষা আপনমনে স্পর্শক্রামী
ধরতে পারে কে জানে কেউ অগোচরে
কনে দেখা আলোয় তখন লজ্জাবতী
চুলের গন্ধ মাখামাখি শহরজুড়ে
 
স্পর্শে তোমার উদ্ভাসিতজানলাজোড়া  
নিপুন বাহু জড়িয়ে রাখে ব্যাকুলতা
আমি ছিলাম আমি আছি ভুবন জুড়ে
হাত বাড়ালেই অনুভবে কল্পলতা
 
যখন তুমি হাত বাড়ালে অনুভবে
আমি তখন চোখ বুঁজেছি বিমোহনে
চাঁপার কলি আমার গালে পল্লবিত
দুঠোঁট জুড়ে অনুরাগের স্বপ্ন বোনে
 
মুগ্ধ বিকেল অশথডালে সম্মোহিত
আবছা শরীর কথাকলি বৃক্ষমূলে
দুহাত বাড়াই দৌড়ে এসে চৌপদীতে
চিত্রপটে শিল্পী তখন দোলাচলে
 
অবশেষে আঁধার নামে বাগান জোড়া
শঙ্খলাগা আবছা ছবি সান্ধ্য ধোঁয়ায়
মিলিয়ে যাবে চূড়ান্ত প্রেম সাঙ্গ হলে
অগোচরে শিশির ভেজা বকুলপাতায়
 
©গৌতমদত্ত
২৯শে অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
(সোনালী সকাল - কুহেলী সংখ্যা - পঞ্চম সংখ্যায় প্রকাশিত)

 

##


Comments