আমার কবিতা - ৩
হ য ব র ল - (৫)
তোমার সে ছবি মুক্তির স্বাদ অবিরাম চেনা ছন্দ।
আজ মুক্তি। আপাতত:। কদিনের সঞ্চয় আজ কলকাতাগামী। ছোটনাগপুরের শাল-সেগুনের
ধোঁয়া ওঠা গন্ধের বিরতি। হয়তো বা তোমার ও। শহুরে জঞ্জালে আবার সেই পুরোনো ছক। বিষাক্ত
নি:শ্বাস। ফেলে আসা দিনের সিল্যুয়েট মনের আনাচে কানাচে।
ফিরে গিয়ে যদি তোমাকেই পাই তৃপ্ত এ অনুভব।
রাঁচি ফিরিয়ে দিল কত কিছু। সময়টা পলকেই ছুঁয়ে দিল কিশোরবেলা। রেডিওতে
বাজছে 'তুমি প্রিয়া আমি প্রিয়'। জয়শ্রীতে দেখছি 'পথে হল দেরী'। তুমি ফ্রক ছেড়ে শাড়ি।
ভোরের কলেজ। ফাঁকা বাস। লাফিয়ে ওঠা বাসে। তুমি ঠিক ড্রাইভারের পেছনে। আমি পাশের জেনারেল
সীটে। বাসের দরজার দিকে আমার মুখ। তোমার চোখ বাঁদিকের জানলায়। ভোরের হাওয়া ওড়ায় আমার
চুল। শ্যামবাজারে ঘোড়ার পিঠে নেতাজী প্রস্তুত। ঘোড়ার লেজ উড়ছে হাওয়ায়। বিধান সরণীর
বদলে তখনো কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট। ট্রাম লাইনের ওপর দিয়ে ছুটে চলা ভোরের বাস। তোমার নামার
পালা। শুধুই চেয়ে দেখা। তারপরে বাড়ি ফেরা।
তখন হঠাৎ যদি মেঠো পথে পাই আমি তোমারে আবার !"
হারায় যে হলুদ কেশর কদমের বুকে গিয়ে।
তেমনি তোমার ছবি অস্ফুট হয়ে এলে পরে
যত পারি ফিরে যাই সেদিনের সেই খেলাঘরে।
রাঁচি।
সূচী-
#
সারাদিন ধরে ডাকে বাঁশুরিয়া স্বপ্নেতে বহুদূর-
উচাটন মন যখন তখন, কাছে পেতে শুধু চায়,
হলদে পাখীটি ডানা মেলে ওড়ে নীল আকাশের গায়।
ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘে পাখী উড়ে চলে দূর থেকে আরো দূরে-
তার সাথে চলে তোমার স্বপ্ন সোনাঝরা রোদ্দুরে।
মন বলে হায়, কবে পাব তারে, কোন সে অচিন দেশে
যদি কাছে এসে হাতটা বাড়ায় একফোঁটা ভালবেসে।
মন খালি বলে হাতটা বাড়াতে সব কিছু দ্বিধা ফেলে
অজানা ভয়েতে থাকো জড়সড় কোনো কিছু না বলে।
সেই কবেকার কথা। তবুও তো মনে এসে গেল। এই বোধহয় প্রকৃতি’র দান। শহরের ব্যস্ততায় সুপ্ত
যা, এখানে, এই সাঁওতাল পরগনার হৈমন্তী হাওয়ায় বিদ্যুৎচমকের মতো মনে মনে ধাবমান। কেন
এমন হল ? যাত্রাপথের শেষ বেলায় এ কি অনুরণন
!
শব্দেরা আজ বহুদূরগামী
অভিলাষে ফাঁকা ঘর
কাঙ্খিত রূপ পথ খুঁজে ফেরে
বিরহিত প্রান্তর।
কেন ? কেন ? কেন ?
উত্তর অজানা। শুধু বয়ে চলা সবকিছু। এই জীবনের পাতায় পাতায় যতকিছু
রোদ—বৃষ্টি—ঝড় সব যেন মমি হয়ে ছিল মনের মিশরে।
এই কদিন ধরে ছোটনাগপুরের দৃশ্যকল্প আমায় ফেরৎ দিচ্ছে পুরোনো হাহাকার। মনের প্রহরে প্রহরে
উঠে আসছে সামুদ্রিক লাল কাঁকড়া। আনন্দের। যন্ত্রণার। বিষাদের। এমনই কি হয় প্রেমে
! না কি এটা ব্যতিক্রমি এক উপাচার। এ শুধু
আমারই বোঝা। তুমি তো নৌকো ভরে তোমার বোঝা নিয়ে কোথায় যে চলে গেলে ! হতভাগ্য প্রেমিক আমি একাকীই বয়ে বেড়াচ্ছি আমার সোনার
ধান।
মরুভুমি আজ মেলেছে পাখনাশুকিয়ে গিয়েছে মায়া।
মন্দিরে বাজছিল ঘন্টাধ্বনি। দামোদরের বুকে উপছে পড়েছে ভৈরবী’র জল। সাদা ফেনায় ফেনায় ঝর্ণার
উচ্ছলতা সর্বক্ষণ। মন্দির সোপান নেমে গেছে দামোদরের বুকে। ছবি এল মনে। এবারে তোমার
লাল পাড় কস্তা শাড়ি। হাতে পুজো উপাচার। জল স্পর্শ করে সোপান বেয়ে উঠছ মন্দির প্রান্তে।
‘পিছন হইতে দেখিনু কোমল
গ্রীবা / লোভন হয়েছে রেশম চিকন চুলে।’
কোমর ছাপানো কালো চুল মাঝে মাঝে হাওয়ায় উড়ছে। আলতা মাখা পা’য়ে রুপোর সরু নুপূর। কোমল অথচ গভীর ছন্দে তুমি টপকে
যাচ্ছ একটার পর একটা সিঁড়ি। আমার দৃষ্টি স্থিত। অচেতন। বাহ্যজ্ঞানহীন।
তুমি মিলিয়ে যাচ্ছ ক্রমশঃ মন্দির প্রাঙ্গণে। আমি নিরুপায়।
শূন্যপানে চেয়ে থাকা শুধু উড়ে যায় প্রজাপতি
পাতারা হাওয়ায় কাঁপে তবু যেনঅন্ধ নিয়তি !
ফিরে আসি একা। টালমাতাল। হেমন্তের অরণ্য চিরে। ঝরে পড়া পাতা মাড়াই।
দূরে সব কিছু আবছায় আবৃত। শুকনো পাতার গন্ধে নাক বুঁজে আসে। দুপুরের রোদ ঝরে পড়ে শাল—সেগুন—মহুয়ার মাথায় মাথায়। দামোদর দূরে
সরে যেতে থাকে। ঝর্ণার কলধ্বনি অস্পষ্ট মেদুর। বেলা বাড়ে ছিন্নমস্তা’র মন্দির চাতালে। সম্রাজ্ঞীর
মত তুমি চলে যাও আমাকে পেছনে রেখে। মারুতির কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে যায় পীচ ঢালা রাস্তায়।
সকাল দুপুর বিকেল হারালো মন থেকে বহু দূরে
বাস্তবতাও পরাধীন হয়ে মিশে গেল রোদদুরে।
জীবন এখন যন্ত্রণা বোধ পদে পদে দিন গোনা
আমি যেন তার ক্ষ্ণিক অতিথি অকারণযন্ত্রণা।
২৬শে অক্টোবর, ২০১৬।
রাজারাপ্পা, ঝাড়খণ্ড।
ছবিরজন্যকৃতজ্ঞতা = গুগুল
#
হ য ব র ল – (৩)
খুব প্রেম পায় এই অবেলায় মনের ভেতরে।
ঋজু শাল গাছ ঝুঁকে চায় প্রেম অবাক করেই।
কেন এমন হচ্ছে বলো দেখি ?
এমনতো হওয়ার কথা ছিল না ! সেতো কতকাল
হয়ে গেল। তুমি ফেলে গেলে আমায় নতুন চিকন পাতা খুঁজে। ভুলেও তো গেছিলাম আমি। ‘সেদিনের চুম্বনের 'পরে / কত নববসন্তের
মাধবীমঞ্জরী থরে থরে / শুকায়ে পড়িয়া গেছে ;’।
স্মৃতি ফিরলেই যন্ত্রণার দায়ভাগ। তার চেয়ে এই বেশ। কিন্তু মন তো মানে না। বেলা অবেলায়
এবং এই পড়ন্ত বেলায় রেখে যাই কিছু কথা। ‘হঠাৎ
দেখা’র মত যদি তোমার চোখের
আলোয় ছায়া ফেলে এই নির্জন মগ্নতা। এই বর্ণসমষ্টিগুলোর ফুটে ওঠা পাপড়িতে যদি একবার তাকাও
কখনো। তখন মনে কোরো, এই দিনান্তবেলায়ও আমি, ‘তবু
জানি, একদিন তুমি দেখা দিয়েছিলে বলে / গানের ফসল মোর এ জীবনে উঠেছিল ফলে, / আজও নাই শেষ ;...’
পড়ে থাকা কার্তিকের খড়-ভরা মাঠে, যেমন গিয়েছে চলে ধানশীষ সব
আমার জীবন থেকে কবে যেন চলে গেছ দূরে— মুছে দিয়ে সব উৎসব।
তবুও জীবন চলেছেই। সময়ের হাত ধরে। কালের চাকায় সবকিছু মিটে যায়
বটে ! তবে কেন আজ এই মায়াবী স্মরণ। মনে হয়,
এই তো সেদিন যেদিন তুমি জড়ালে জীবন তোমার নতুন জগতের চৌহদ্দিতে তখন তো আমি সাঁওতাল
পরগণায়। শক্তি চাটুজ্জের কবিতার কলম ধরে, মহুয়ায় নেশায় জ্বালা জুড়োব বলে এই শাল-সেগুনের
দেশে ‘মনে মনে বহুদূর চলে
গেছি - যেখান থেকে ফিরতে হলে আরো একবার জন্মাতে হয় / জন্মেই হাঁটতে হয় / হাঁটতে-হাঁটতে
হাঁটতে-হাঁটতে / একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে পৌঁছুতে পারি...।’ তবুও কি যায় পৌঁছনো যে পথ থেকে
তুমি চলে গেছ অনেক দূরে—আকাশ
যেখানে লুকিয়েই গেছে আমার চোখের সামনে থেকে ?
এক জন্মের কাজ না কি তা ? ‘দুটো জন্মই লাগে / মনে মনে দুটো
জন্মই লাগে’।
কবেই তো ফিরে গেছি নিজের খেয়ালে চাকরীর টানে—
প্রেম তবে শখ ছিল নাকি ? তবে কার ? কেউ-ই কি জানে ?
সেই ছোটোনাগপুর ! সেই সাঁওতাল পরগণা ! আর তাই কি মনের গহনে সেই পুরোনো সেলুলয়েডের রিল
! কে জানে। নিশ্চই কেউ জানে। কে সে ? সে কি এই শাল-মহুয়ার হাওয়া। দূরে দূরে অবিশ্রান্ত
টিলা আর খোলা মাঠে মঙ্গলবারের হাট ! প্রকৃতির সান্নিধ্যতায় ফেলে আসা দিনের প্রজাপতির
রঙিন পাখনার ওড়াউড়ি। বয়ে চলা সুবর্ণরেখা’র
হাঁটু জলে তোমায় পায়ের ওঠানামা। কি স্বর্গীয় সেই অনুভব। কি অপরূপ দৃশ্যকল্প !
এখনো তো মনে হয় তুমি আছ, আছো তুমি সারাক্ষণ ধরে
মহুয়ার নেশা চাই, মাথায় তোমার ছবি কেন এত ঘোরে !
পেছন থেকে তোমার সে কস্তা পাড় নীল শাড়ি ওড়া দেখি। তুমি হাঁটছো।
আমি অল্প পেছনে। চারদিকে খুশীর হেমন্ত বাতাস। শির্শিরানি। রাস্তা নেমে গেছে বাঁধের
জমা জলের দিকে। জলে চিকচিকে ঢেউ-এর খেলা। তুমি হেঁটেই যাচ্ছ। যেভাবে হয়ত হেঁটেই চলে
গিয়েছিলে আমার স্মৃতির দরজা পেরিয়ে খিড়কি’র
অন্বেষনে। তবে কেন ফেরা ? আমার দমবন্ধ বুকের
অতলে। আমার চোখের প্রতিফলনে। আমার মুগ্ধতায়। আমার সর্বাঙ্গ জুড়ে ফিনিক্স পাখির মত।
পেরেছ কি ভুলে যেতে কত স্মৃতি কত সাজ
আমি তো ভুলিনি কিছু, গালে টোল, চোখে লাজ
ঠোঁট-দুটো থরথর কথা শেষ হলে পরে
তারপর বারবার আমি ফিরে গেছি ঘরে।
২৫শে অক্টোবর, ২০১৬।
ডোরান্ডা, রাঁচি।
#
হ য ব র ল – (২)
ফাঁকা ক্ষেত ভরে থাকে তোমার ছায়ায়
নীল শাড়ি কস্তা পাড়ে চোখে পড়ে আলো
বিকেলের গন্ধ ওড়া নদীটির পারে
তোমার অলীক ছোঁয়া আমায় জড়ালো !
সন্ধ্যার মেঘমালা হেমন্ত হাওয়ায়। সাঁওতাল পরগণার পাথুরে মাটিতে
তোমার আমন্ত্রণ আমার বকুল ঝরা মনে। দিগন্ত বিস্তৃত শাল-সেগুনের অরণ্য চিরে যে পীচের
পথগুলি যে তোমার অপেক্ষায় ! যদি একবার পথ ভুলে—
কোনো এক কালো পীচঢালা রাস্তাকে গোধূলির সূর্য ডোবার রঙে রঙিন করে দিয়ে – নীল শাড়ির কস্তা পাড় আঁচল উড়িয়ে
এই যাবার বেলায়, সম্রাজ্ঞীর মত মাথা উঁচু করে তুমি এসে পড়, আমার সেই জেগে থাকা প্রেমে
আভূমি নত হয় বরণ করে নেব। কথা দিলাম।
অস্ত-পারের আলো ছড়িয়ে পড়বে শাল-সেগুনের পাতার ছায়ায় ছায়ায়। তোমার
সুবাসে থেমে যাবে সব কিছু। আঘ্রাণে হেমন্ত মায়া !
‘শূন্য এখন ফুলের
বাগান, দোয়েল কোকিল গাহে না গান, / কাশ ঝরে
যায় নদীর তীরে’। সে যায়
যাক্। তুমি এলে আমার বোধোদয়। আমার বেঁচে থাকা। আমার আগামী জীবন।
আসছ তুমি হঠাৎ দেখি শাল মহুয়ার পাতার ভীড়ে,
দূর হতে পাই গন্ধ তোমার পুরোনো সেই স্মৃতি চিরে—।
হারানো মনে এখনো, তোমার কি উজ্জ্বল উপস্থিতি ! মনের কোনে কোনে কালবোশেখের
ঈশানী বিদ্যুৎচমক। উদ্দাম ঝড় হৃদস্পন্দনের ওঠা-পড়ায় ! শুধু তোমারি নামে উত্তেজনার প্রাথর্না
সঙ্গীত সারা দেহে।‘অঙ্গে
অঙ্গে প্রাণ তব / কত গানে কত নাচে / রচিয়াছে
/ আপনার ছন্দ নব নব / বিশ্বতালে রেখে তাল; / সে যে আজ হল কত কাল।’
তুমি এলে, অনেকদিনের পরে যেমন বৃষ্টি আসে
তেমনি তোমার নামটা এলেই,
আমার মনে শিউলি ভাসে।
ব্যাখ্যা আছে কি কোনো ?
সে তুমিই ভাল জান। আমার উচাটন মন কাকে যেন খুঁজেই চলেছে সারাদিন— , যতক্ষন জেগে থাকে। সেই রক্তের
অবিরাম প্রবাহ যেন ! ছন্দ বা লয়ের পরিবর্তন হয়ত আছে। কিন্তু অপরিবর্তনীয় তার ছুটে চলা— শেষ নিঃশ্বাস ফেলা অব্দি ! তারপর
আর কোনো গ্রহণ নেই শরীরের। আছে শুধু অতীন্দ্রিয় অনুভব।
তুমি যদি পাশ ফেরো অনুভবে যেন আমিও সতত,
তোমার সে ছায়া ঘিরে যাপিত জীবন এখনো আয়ত।
তোমার সে লীলাময়ী করপুটে শিহরিত আমার মুখমণ্ডল। কুন্তলরাশির অস্ফুট
স্পর্শে ‘আমার অঙ্গে অঙ্গে
কে বাজায় বাঁশী।’ চরাচর
স্থির। শুধু তোমারই সে আহ্বান—
স্পর্শে। অকাতর স্নিগ্ধ সন্ধ্যার দোলাচলে রাত্রি আগতপ্রায়। মনে হয় কুরুক্ষত্রের সন্ধ্যার
শাঁখ ঘোষনা করবে আজকের যুদ্ধবিরতি। কর্ণ প্রস্তুত হচ্ছে জাহ্নবীতীরে সন্ধ্যাসবিতার
বন্দনায়। মাতা কুন্তী সলাজে ধীর পায়ে পৌঁছলেন যেমন করে কর্ণ সমীপে, তেমনি করেই না হয়
আমি বন্দনা করি তোমায়। আমার সমীপে এই সুবর্ণরেখার পশ্চিম তীরে তুমি রয়েছ আমার খুব কাছাকাছি,
প্রায় শরীরে শরীর ঘেঁষে। কলাপিত মূর্ছনায়।
কিশোরী বেলায় তোমার বেণীটি পিঠের ‘পরে খেলত দুলে
আমি তখন চন্দ্রাহত নব্য কিশোর পড়াশোনা শিকেয় তুলে।
কতদিন উৎরে গেল ! চলার
ছন্দ কতই না পরিবর্তিত হ’ল।
তবু কেন ! তবু কেন এখনো চোখের কোনে চিক্চিক্ করে জল। এমনই বাঁধন এ ! মাধবীলতা যেমন
দড়ি বেয়ে ওঠে আকাশের দিকে। লতানে বাঁধন। দুজনের। তবেই তো পূর্ণ হয় প্রেম। তবেই তো গন্ধ
ছড়ায় কামিনী, হাস্নুহানা। মান অভিমানের কত খেয়াতরী শান্ত হয়ে ফিরে আসে পারে। সন্ধ্যা
নামে সাঁওতাল পরগনার পশ্চিম দিগন্তপারে।
অবাক রাতের তারারা এবারে মিটিমিটি করে জ্বলবে
তোমার স্পর্শ আমার ভেতরে গুনগুন গেয়ে চলবে।
রাত সারারাত চাঁদ দেবে আলো, আঁধার বিশ্বময়,
তোমার ছটায় ভরে উঠবেই রোমকূপে বিস্ময়।
২৪শে অক্টোবর, ২০১৬।
ডোরান্ডা, রাঁচি।
#
হ য ব র ল – (১)
এখনো তোমার ওড়না আঁচলে স্পর্শ মাখা সুখে
আমার রক্তে ঝর্ণা ঝরায় গোপন সে স্রোতমুখে।
কতবার ; কতবার সে স্পর্শিত শিহরন ! কতবার সে চমক দিয়ে ওঠা ! সরস্বতীর জল যেন। কোথা দিয়ে যে বহে যায়। মাঝে মাঝে
মনের বালিয়াড়িতে দপ করে জ্বলে ওঠা গোপন নদীর জল। ফিনকি দিয়ে চোখে ভাসা। আবার রোদের
ছায়ায় নতুন সে ধারাপাত।
সেদিন বিকেল নেমেছিল ছুঁয়ে কপালেতে পড়া চুলে
একপাশ থেকে অপলক আমি আর সব কিছু ভুলে।
যদিও হেমন্ত বাতাস ওড়াউড়ি করছিল সারা দৃশ্যমানতায়, বসন্ত আসতে অনেক
দেরী তবুও সেই খস্খসানি হাওয়ায় তোমার অন্যগালে পুরো সোনা রোদ। সে আমার অনুভবের ডাকাতি
আয়না। উদাসীন। অপলক। লজ্জাভয় মাখা এক কোমল মুখ। বিকেল চলে গেলে সন্ধ্যের শিশিরের অপেক্ষায়।নির্নিমেষ।
অগোচর।
তখন কি আমি তোমার মনের দরজা দিয়েছি খুলে ?
জানলার পাশে বকুলের ছায়া খেলছিল দুলে দুলে।
পশ্চিমদিগন্তে কনে দেখা আলো। পুবাকাশে নামবে আঁধার। অদ্ভুত এক মায়াবী
দোলাচল। আমার ময়ূরমহলে।ফল্গুর ধারা মেশা মৃদু ব্যথা। তুমি তো পাওনি কখনো ! এ যেন 'এসেছিলে তবু আস নাই, জানায়ে গেলে' মার্কা
অযাচিত কল্পনা। আমার চিদাকাশে। শয়নে, স্বপনে, জাগরণে'যে ছিল আমার স্বপনচারিণী', তার
কাছে শুধুই জমার হিসেব। মনে মনেই গেয়ে গেলাম জীবনভোর, 'আমার লতার একটি মুকুল / ভুলিয়া তুলিয়া রেখো-- তোমার
/ অলকবন্ধনে।'
জীবনের মাঝখানে কেন এ কে জানে মুকুলিত পাতা
চেয়েছিনু মনে মনে কিছুটা সঙ্গোপনে, হল না গাঁথা।
ভেবেছিলে একবার অগোছালো সংসার হয়তো কখনো-
তাই নিয়ে বেঁচে থাকা স্বপ্নের চিতা মাখা বাগান সাজানো।
এই করেই চলে গেল তো নষ্ট জীবন। লীলা আসন্নপ্রায়। সন্ধ্যাসূর্য নামবে
ক্রমশ:। ঢালু পথ গড়িয়ে নামে দক্ষিনাকাশে। এইখান থেকেই কি শুরু হবে মহাপ্রস্থানের সূচনাপর্ব
অথবা অনিশ্চিত উৎরাই ! জানিনা। জানতেও চাই
না। তোমার সেই স্পর্শের অনুভবেই কাটিয়ে দেয়া যাবে বাকি নি:শ্বাস। এমনি করেই তো রঙিন
লুকোচুরি। জলের বুদ্বুদ মাখা। গহন জলের থেকে জীবনের আকুতিতে ভেসে ওঠা মাছের অনর্থক
নামাওঠা।
“ প্রেম
এসেছিল, চলে গেল সে যে খুলি দ্বার-- / আর কভু আসিবে না। / বাকি আছে শুধু আরেক অতিথি
আসিবার, / তারি সাথে শেষ চেনা।............ ” “আকাঙ্খায়
দিন গোনা। নতুন বরনডালা নিয়ে—
“আরো প্রেমে আরোপ্রেমে
/ মোর আমি ডুবে যাক নেমে”।নত নয়নে স্তব্ধ প্রহর। নিশ্চই
আসবে তুমি। হোক না সে অন্য রূপে। বাসবদত্তার মত করে।প্রাণের লহরী তুলে স্তিমিত ছন্দে।
গাঁথব না হয় নতুন করে সন্ধ্যাবেলায় যুথীর মালা—
আপনি এসে পরবে নিজে পিছন থেকে যাবার বেলা।
ডোরান্ডা, রাঁচি।
#
ফুল ফুটবেই—
আরও গভীরে যাও। আরো—
; এই কথা বলে গান থেমে গেল অকস্মাৎ।
বল্মীক গভীর খোঁজে জীবনের উপাচারে। শিকড় গভীরে গিয়ে আরো—
নিরুপায় রাস্তা খোঁজে সবুজের তাগাদায়। আমরা ব্যতিক্রম তাই—
পদ্মযোনি খুঁজে চলি সাপের মতন মৃতছকে শিকারের অপেক্ষায়।
একটি সুন্দর মুখ সঙ্গোপনে কতোবার নিরুচ্চার রয়ে গেছে জানি !
কারন আমিই সেই আদিমতা, বন্য, হিংস্র, ধর্ষণ করেছি বারবার—
কল্পনার বোধিবৃত্তে। লয়হীন অবয়ব ও দোলা দেয় মিনসে চিত্তে
সংবেদী আচারেই। এই কথাজেনে বুঝে চারদিকে ঘেরাটোপ তুলি।
রোদের তাপে’তে পোড়ে লজ্জামাখা জলছাপ, মনের ভেতরে অন্ধকার।
শব হয়ে পড়ে থাকা—, তার চেয়ে ভাল তবু মনে মনে রূপক প্রয়াস।
গভীরতা বাঙ্ময় হয়ে যদি ফুটে ওঠে কোনো এক উজ্জ্বল সকালে—
তবে জেনো সেই দিনতুমি হবে বকফুল, ঘেঁটুফুল আমার ঠিকানা।
২০শে অক্টোবর, ২০১৬
কলকাতা
বল্মীক গভীর খোঁজে জীবনের উপাচারে। শিকড় গভীরে গিয়ে আরো—
নিরুপায় রাস্তা খোঁজে সবুজের তাগাদায়। আমরা ব্যতিক্রম তাই—
পদ্মযোনি খুঁজে চলি সাপের মতন মৃতছকে শিকারের অপেক্ষায়।
একটি সুন্দর মুখ সঙ্গোপনে কতোবার নিরুচ্চার রয়ে গেছে জানি !
কারন আমিই সেই আদিমতা, বন্য, হিংস্র, ধর্ষণ করেছি বারবার—
কল্পনার বোধিবৃত্তে। লয়হীন অবয়ব ও দোলা দেয় মিনসে চিত্তে
সংবেদী আচারেই। এই কথাজেনে বুঝে চারদিকে ঘেরাটোপ তুলি।
রোদের তাপে’তে পোড়ে লজ্জামাখা জলছাপ, মনের ভেতরে অন্ধকার।
শব হয়ে পড়ে থাকা—, তার চেয়ে ভাল তবু মনে মনে রূপক প্রয়াস।
তবে জেনো সেই দিনতুমি হবে বকফুল, ঘেঁটুফুল আমার ঠিকানা।
কলকাতা
#
অজ্ঞানতা—
অজান্তে রেখেছি হাত ; কোরকের নাভিমূলে বে-খেয়ালে। পিঁপড়েরা
অতিক্রম করে চলে— তাদের চলার পথে সোজা বাঁকা সবকিছু !
অজ্ঞানতা অপরাধ নয়, আপেলের সবটুকু খেয়ে নিয়ে যদি কিছু—
জ্ঞানহীন তির্যকতা ; চালাকির দ্বারা কাজ হয়ে যায় অকস্মাৎ।
অশিক্ষিত মূর্খ জানে চলাফেরা গতিবিধি। শিক্ষিত চালাক মন
ধুরন্ধর তৎসম। সত্যি জানে সত্যি শুধু বিশ্বাসে মিলিয়ে বস্তু !
অজানিত রাখা হাত যদি আরো নীচে নামে ; যদি খুঁজে চলে ফের—
গোপন সুড়ঙ্গ পথ, পাখীদের বাসা বোনা—কিম্বা পাকা আতা ফল ;
তখনো কি ‘অজ্ঞানতা’ বিশেষণ ? অথবা সুর্যের আলো নিরপেক্ষ, পৃথিবীতে ?
তার চেয়ে ভাল তবু চুপ করে শুয়ে শুয়ে কল্পনায় স্বমেহন।
নাভিপদ্মে হাত রেখে যদি ফোটে পদ্মফুল তোমারি সে আবাহনে—
তবে জেনো তুমি, কালচক্র ঘুরবেই— অনুধেয় উত্তরণে।
১৮ই অক্টোবর, ২০১৬
কলকাতা
অতিক্রম করে চলে— তাদের চলার পথে সোজা বাঁকা সবকিছু !
অজ্ঞানতা অপরাধ নয়, আপেলের সবটুকু খেয়ে নিয়ে যদি কিছু—
জ্ঞানহীন তির্যকতা ; চালাকির দ্বারা কাজ হয়ে যায় অকস্মাৎ।
অশিক্ষিত মূর্খ জানে চলাফেরা গতিবিধি। শিক্ষিত চালাক মন
ধুরন্ধর তৎসম। সত্যি জানে সত্যি শুধু বিশ্বাসে মিলিয়ে বস্তু !
অজানিত রাখা হাত যদি আরো নীচে নামে ; যদি খুঁজে চলে ফের—
গোপন সুড়ঙ্গ পথ, পাখীদের বাসা বোনা—কিম্বা পাকা আতা ফল ;
তখনো কি ‘অজ্ঞানতা’ বিশেষণ ? অথবা সুর্যের আলো নিরপেক্ষ, পৃথিবীতে ?
তার চেয়ে ভাল তবু চুপ করে শুয়ে শুয়ে কল্পনায় স্বমেহন।
তবে জেনো তুমি, কালচক্র ঘুরবেই— অনুধেয় উত্তরণে।
কলকাতা
#
শব্দ—
শব্দের কি জাত থাকে ? পেডিগ্রি’র ধুয়ো তুলে যেসব মানুষজন
‘জাত গেল—জাত গেল’ চিৎকারে অহরহ। ইন্দ্রনাথ ভাসে মনে।
শব্দ’তো নদীর মত— পাষাণী অহল্যা নয় ! কাঠকুটো জড় করে—
বাসা বাঁধা অনুক্ষণ। লেখা শোনা অনুভব, কতো স্তর ধাপে ধাপে।
শরীরে চমক আনে কত নীচু ডেসিবেল ! পাতা ঝরা শব্দ—সঙ্গে।
আগুনের শব্দ আঁচ—জলে নিভে শব্দময়। সঙ্গমের শব্দ বেশ !
তবু তার প্রকাশে অনীহা। জারজতা গিলেখায় মনের গোপন কোন।
ভাল লাগা মনে মনে তবুও ক্লেদাক্ত মনন ল্যাজ ধরে টান মারে।
বিনাশব্দে জন্ম নেবে আগত দিনের শিশু অভিপ্রায় ঝরে পরে।
জয়দেব ফিরে যায় গীতগোবিন্দম যদি এডিট করতে হয় !
১৬ই অক্টোবর, ২০১৬।
কলকাতা।
‘জাত গেল—জাত গেল’ চিৎকারে অহরহ। ইন্দ্রনাথ ভাসে মনে।
শব্দ’তো নদীর মত— পাষাণী অহল্যা নয় ! কাঠকুটো জড় করে—
বাসা বাঁধা অনুক্ষণ। লেখা শোনা অনুভব, কতো স্তর ধাপে ধাপে।
শরীরে চমক আনে কত নীচু ডেসিবেল ! পাতা ঝরা শব্দ—সঙ্গে।
আগুনের শব্দ আঁচ—জলে নিভে শব্দময়। সঙ্গমের শব্দ বেশ !
তবু তার প্রকাশে অনীহা। জারজতা গিলেখায় মনের গোপন কোন।
ভাল লাগা মনে মনে তবুও ক্লেদাক্ত মনন ল্যাজ ধরে টান মারে।
জয়দেব ফিরে যায় গীতগোবিন্দম যদি এডিট করতে হয় !
কলকাতা।
#
নরম নরম ভিজে মেঘ ছুঁয়ে দেয় যদি তারে, এইরূপ আশা নিয়ে—
খাড়া হয়ে থেকে যায়। হাঁটু মুড়ে বসবার সাধ হয় কতোবার,
কতোবার সাধ জাগে উবু হয়ে শুয়ে পড়ে পুকুরের জল ঘাঁটে—।
মসৃন জলের স্বাদ পেতে চায় কতোবার— ! চিন্তার ভেতরে তার।
পাবে না তা কোনোদিন—, এটাও সে জেনে গেছে ; বুঝে গেছে, বেঁচে থাকা
অসফল বর্ণহীন। তবুও তো বেঁচে থাকা, অনাগত স্বপ্ন বুনে—
জীবনের চলাফেরা, ক্ষণিক ফলের লোভে। ধন্য আশা মায়াময় !
শরীরে নরম স্পর্শ, আনাগোনা উঁচুনীচু— হরেক মেঘের সাজ !
কলকাতা।
নদী নেমে গেছে নীচে— দুই পারে ক্যাসুরিনা, ছায়া ছায়া রোদ্দুর—
পড়েছে আমার পিঠে। ভিজে মাটি ছোঁয় হাত, কিছু দূরে চিকচিকে
বালি খুঁড়ে পেতে চাই নদীর গহন স্বাদ ; মাঝে মাঝে লোনা ফেনা
জিভ ছুঁয়ে চলে যায় তরঙ্গের অভিঘাতে। আকন্ঠ পিপাসা যেন
সাময়িক স্বস্তি পায় জোয়ারের উষ্ণতায়—। তারপরে ভাটা এলে
গাঢ় হয় নদী-জল সাগরের মুখে এসে বিপরীত সংগমে।
যেন কত চেনা ছক কাটাকুটি খেলা ঘিরে, বয়ে আসা নিয়মের।
বাতিঘর চেয়ে থাকে জোয়ারের আকাঙ্খায় ; একা একা এক ধারে।
কোজাগরী। কলকাতা।
আমাদের এই কলকাতার !
চারদিকে অকাল—ফোটা চন্দ্রমল্লিকা—
সতেজ উলম্ব উদ্ধত অথচ কি মায়াময় !
ঝক্ঝকে ব্যানার শোভিত রাজপথ শ্রাবস্তীময়।
পায়ে—চলা—পথ মুখরা, কলকাকলীময়।
হাঁপ ছেড়ে বাঁচে পশ্চিম প্রবাসে।
বিপরীতে সানাই বাজে—
কলকাতা ভরে ওঠে প্রবাসী আগমনে।
ভেলপুরি—ফুচকা—চাট আর মোগলাই পরোটায়
সূর্য ফেরে মুখে।
চন্দ্রমল্লিকা— জলে ভিজে আরো প্রাণ পায়
সন্ধ্যের আলোঝর্ণায়। কলকাতা হেসে ওঠে,
উদ্দাম বেপরোয়া ভঙ্গিমায়।
অন্ধকার নামে দশমী—সন্ধ্যায়।
ফাঁকা রাস্তাঘাট, বাজারে আখগুচ্ছ আর অজস্র পট।
চন্দ্রমল্লিকা’রা চলে গেছে অপরূপ কোনো দুগ্গার দেশে।
যেখানে শব্দ নেই আর—
নেই আর আমাদের মত হাভাতে’র দল।
কোজাগরী পূর্ণিমা। কলকাতা।
স্থির থাকে কোনো দিন ? অগনন ঢেউ যত ছুটে ছুটে কামড়ায়
হলুদ বালির দানা। স্তোকবাক্য মধুময়, অঙ্কুরিত হলে প’রে—।
সোনালী ধানের শীষ নেগেটিভ হয়ে যায় তুমি ফিরে গেলে পরে।
দশমীর নদীজলে জেগে থাকা মুখ শুধু ; বাকি থাকে অন্ধকার।
জীবনের পোড়া ঘাটে অপার শ্মশান জাগে সারাদিন সারারাত।
মাঝরাতএসে বলে— এবার ঘুমোও তবে, একাদশী এসে গেছে
হিম ঝরা শরতের গন্ধ নিয়ে বাঙলায়—শাপ্লার আধো জলে।
মালা ভিজে আলুথালু। সবশেষে বিন্দু বিন্দু জল অপরূপ নথে।
কলকাতা
চৈত্রের দুপুরের গনগনে আগুন নয় ;
বর্ষার শ্মশানে টায়ারে পোড়ানো শবের আগুন নয় ;
তারও চেয়ে বেশী—
বৈদ্যুতিক চুল্লীর অন্তরের মতো আজ আমি
জ্বলে উঠতে চাই।
যাতে করে বেশ একটা
সময় কাটানো খিল্লি’র গন্ধ ভেসে আসে—
অকারণ একটা চিয়ার্স করা যাবে ভেবে।
সময় পাবেন তো ?
চোখে দেখার মত অন্ধকার নেই।
কানে শোনার মত নিস্তব্ধতা নেই।
নাকে নেবার মত গন্ধ নেই।
জিভে স্বাদ নেবার মত জিনিষ নেই।
আর ত্বকের যত্ন নিতে বলার মত মানুষ নেই।
কানের জন্য ডিজে আছে—
নাকের জন্য ভরদুপুরে জঞ্জালের লরী আছে—
জিভের জন্য পাড়ার মোড়ে মোড়ে দিশীবিলিতি সুরার দোকান আছে—
আর ত্বকের জন্য অপর্যাপ্ত কাটাতেলের ধোঁয়া।
আগুনে পোড়াব আমার প্রেম এ পোড়া শহরে—
আমার ভালবাসা।
দাবানলের মতো পোড়াব এ শহর—,
সেই আঁচে ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে—
যদি ভালবাসা ফিরে আসে !
কলকাতা।
মৌচাকের কোষে কোষে মধু
যেরকম আষ্টেপৃষ্ঠে খুঁজে দেয় মিষ্টতার স্বাদ,
তেমনই মননের কোটরে কোটরে মাঝে মাঝে
অন্ধকারে
টিকটিকি ডাকে ; আর
ঠিক তখনই মনে ভাসে— কাঁথা সেলাই-এর
লম্বা লম্বা টানে এখনো জড়িয়ে আছো তুমি।
জীবন দেয় না ফেলে অন্য কারো কাছে।
এটাই নিয়ম শুধু, মানুষের ঘরে ঘরে ঘোরে ;
একা হলে বোঝা যায়— রাতের তারার মত
অগণন শুন্যতায়।
বিজোড় হলেই তবে থেকে যায় ভাগফল
নিশ্চিত গনিতে।
একা একা কারো মনে হেঁটে যায় পড়ে থাকা
ভাগফল। সুদকষা জীবনের অম্লান যাত্রায় !
কলকাতা
আমার গায়ে গন্ধরাজ।
তোমার তীব্র আকুতি আর আমার
ভারী গন্ধ।
এপারে যদি ছায়া হয় অপর পারে রোদ্দুর।
বেশ চলছিল।
বিকেলের কমে আসা আলোয় গন্ধরাজের সাদা
পাপড়িময় এক হলুদাভ আবেশ।
ডিজেলের ধোঁয়ার কুন্ডলী পাক খায় অবিরল।
নিরুপায় মন অবিশ্বাসী পুতুলখেলায় !
বার্বি’তে বিষপান দেশ থেকে মহাদেশে।
ছোট্ট সেই পুতুল-বর সুতো কাটে চাঁদের বুড়ির পাশে বসে।
হতভাগা আজ একা !
সংসার বাড়ন্ত আজ সদাগর জালে।
ভাল থাকা নিয়ে।
পায়ে চলা মেঠোপথ মুছে দেয় রাতজাগা জানোয়ার।
শুধু পড়ে থাকা ক্লিন্ন পাতা,
হাওয়ায় হাওয়ায় ওড়ে—
নাগালের আকাঙ্খায়।
কলকাতা
ক্ষেতের মাচায় নষ্ট শশাদের মত
একেবারে নষ্ট হয়ে যেতে,
তবে— তাড়াতাড়ি যাওয়াই ভালো মনে হয় !
উঁকি যেন মারে নাকো নতুন শশা’র ফুল
রাত, ভোর হলে পরে।
বর্ণমালা জন্ম নেয় প্রগাঢ় আশায়।
উবু হয়ে বসবার আছে কোনো প্রয়োজন—
বাংলার এ নরম জোৎস্নায় ?
বেহুলার ভেলা ভেসে গেছে কবে সমুদ্রযাত্রায়।
২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬
কলকাতা।
তার সাথে মন ঠেকা দিয়ে শুধু যায়।
লজ্জায় মেশা হাতছানি মনগড়া
দূর থেকে শুধু চোখখানি ছলকায় !
ফুলে ফেঁসে ওঠা জলের সে দাপাদাপি ?
একমুখী মন তেমনি করেই চায়
মিলতে মেলাতে যেটুকু সময় বাকি—।
আনন্দে মন ফুরফুরে সহজিয়া—
চোখেতে তখন অবাক আলোর নেশা
উত্তাপে মন, ভরে দেয় সব পাওয়া।
দূর থেকে শোনা মেঠো বাঁশীটির টানে—
অল্প-স্বল্প বৃষ্টিও ছিল সাথে,
ছিল নাকো ভয়— সুর উঠেছিল প্রাণে।
নিজের খুশীতে তুলেছিল কত সুর !
ভেবেছিল নাকি— ! রাধা এসে তার সাথে
দেখবে আকাশ কিম্বা সমুদ্দুর ?
এখনো সে মনে ভাসে সেদিনের কথা—
কত না বছর পেরিয়েও কথা কয়
সে-দিনের সেই চঞ্চল আকুলতা।
তা বলে কি—রাধা,মন খানা বদলায় ?
কলির কানাই ঠিক খুঁজে নেয় মন
কোন রাধা তার ঈথারেতে ডাক দেয় !
১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬
কলকাতা।
উড়ে যায়—
লোহার চাকায়।
কল্লোলিনী জানে শৃঙ্খলিত সংযম মাটির তলায়—
হয়তো বা !
অনুভব কি মগ্ন করে বোধ ?
যে মানুষ, একদিন দেখেছিল
মানিকের কু-ঝিক-ঝিকে ধোঁয়ার ওড়াউড়ি,
সে মানুষ আছে নাকি আর ?
বেঁচে আছে নাকি ? তার—, সেই অদ্ভুত অনুভূতি মন !
বোধ খানি চলে গেছে দূরে— আরও দূরে,
হয়তো বা সুমেরু ছাড়িয়ে—
ঠাণ্ডা বরফের মাঠে।
একদিন ফিরবে কি আর ?
নিঃশব্দ রাতে বিষ খায় শহরের প্রাচীন সবুজ।
রোদ আসে ঘরে—
নীচের শহর ফুঁড়ে,
গর্ব চলাচল করে,
বোধহীন অনন্ত যাত্রায় !
কলকাতা।
রামদীন কাকা— ?
ভাবতে পারিনি কোনোদিন,
ঘুম থেকে তুলে নিয়ে কেউ কখনো ‘ওলা’ চাপাবে !
ওলা চাপা তো হলো ! ফুটপাথের বাসিন্দার স্বপ্নও—
সত্যি হয়ে যায় মাঝে মাঝে।
কাগজ বিক্রি করে রামদীন কাকা।
রোজ সকালে দেখি বাবু আর দিদিরা একটা করে
ওই কাগজ কেনে আর নিয়ে যায় বেশ পাকিয়ে পাকিয়ে।
রামদীনকাকা’র কাছে কত আরো ছবি দেয়া বই থাকে।
আমি তো পড়তে পারিনা তবু জানি, রামদীনকাকা বলে—
আরে, ইসমে খবর রহতা হায় রে বেটি।
রাত হলে দোকান গুটিয়ে বাড়ি যায় কাকা।
আমরা সব ভাই, বোন মিলে মাদুর পাতি ওই জায়গায়।
শুরু হয় সাপলুডো খেলা।
সেদিন বিস্টি হয়েছিল সন্ধ্যেবেলায়।
মা রান্না করেছিল ভাত আর কুমড়োডাঁটা’র তরকারী।
তারপরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিই না।
তারপরে জেগে উঠতেই মনে হল,
চ্যাংদোলা। মুখে কাপড় বাধা।
আমি কোনো গাড়িতে। আমার ওপরে একটা ছেলে।
সারা শরীরে কামড়াচ্ছে কিছু। আর কিছু মনে নেই।
মনে নেই মনে নেই মনে নেই।
কলকাতা খুব ভাল গো দিদিমনিরা, বাবুরা।
আমার মতো রাস্তার মেয়েও ওলা চাপলো !
কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা শরীরটা লাগছিল।
কতো ইচ্ছে হ’ত গো ওই সাদা গাড়িতে চাপার।
রামদীনকাকা—, আমার খবর থাকবে ? কাগজে ?
বাবু আর দিদিমনি’রা অমন করে পাকিয়ে নিয়ে যাবে—
যেমন করে চ্যাংদোলা ?
৯ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬
কলকাতা।
#
বুক্নি—
শব্দের কঙ্কাল শুধু। ঘোরে বেড়ায় নাচে
আর
কথা অনর্গল। ব্যাকরণ—,ছূটে ছুটে
রেসকোর্সে’র
ক্লান্ত ঘোড়া। জিরোয় আজকাল।
টাকা ওড়ে আনাচে কানাচে।
শব্দ ওড়ে মুখ থেকে মুখে—
অবিরল।
— ডিভিসি’র জল।
‘তেয়াগিলে
আসে হাতে’
মোহ অবনত রিপু।
বড়রাস্তার ধারে কাটা পড়ে মেহগনি।
প্রকৃতির ফোড়া ফাটে—
শব্দরূপ ধাতুরূপ বিশেষ্য বিশেষণ অব্যয় ;
লক্কা পায়রার মতো ওড়ে
চারপাশে।
শোণিত উল্লাসে।
৯ই সেপ্টেম্বর,২০১৬
কলকাতা।
#
ফেরা—
পরিণত মাছরাঙা বোঝে নাকি –
কতখানি,
বেগে, মাছ আসে ঠোঁটে। কিম্বা ধরা যাক, পরিযায়ী রুট—
লুডো’র ঘুঁটির মতো গন্তব্যগামী। আধুনিক বাইশ ক্যারাট
মাত্রা পায় রক্তকুঁচে। যোগফল সমান সমান।
সোনা ফলা আবাদী মানবজমি ! হালি শহর—এর সেই বেড়া,
হুগলী’তে ভেসে গেছে কবে ! ফসল—এর তছরূপ—
সিঙুর পাঁচিলে। বর্গী’তে ধান ছেড়ে ঢেরা দেয় গ্রামে।
উন্নত বাঁধ ভাঙে উন্নত মেশিন। মাছ ফেরে জলে—
গাছে ফেরে পাখি। পরিণত মাছরাঙা উড়ে যায় বেগে।
তীব্র আবেগে।
৬ই সেপ্টেম্বর,২০১৬
কলকাতা।
#
অসংগত—
যদি পারো হঠাৎ করেই ফুল ফোটাবার ছলে
তোমার ঠোঁটের কাঁপন যেন বিকেল রোদে জ্বলে—
আমি তখন তোমার পাশে আমের বউল মেখে
গন্ধ নেব তোমার বুকের গহন খাঁজের থেকে।
সারা শরীর জুড়ে তোমার নামবে বাদল বেলা
একটু না হয় অসংগত,করবো অনেক খেলা।
ঘন মেঘের আওয়াজ ছেয়ে আকাশ হবে কালো
তোমার ছুটি আমার বুকে হঠাৎ করেই আলো।
এই অব্দি ঠিকই ছিল বাদল মেঘের কাছে—
উন্মনা মন দুজনের’ই এমন করেই বাঁচে।
না হয় তোমার অন্য ঘরে বাঁচার রসদ পাকা
একটুখানি সহজ হলেই পটের ছবি আঁকা।
এসো না হয় সময় হলে মিটিয়ে যত কাজ
তোমায় না হয় পরিয়ে দেব আমার যত সাজ।
১লা সেপ্টেম্বর,২০১৬
কলকাতা।
(মায়াজম - কলকাতা বইমেলা সংখ্যা ২০১৮ য় প্রকাশিত)
#
এসো একবার--
সমুদ্রের ঢেউ এর মতো
সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে সাদা ফেনার মত
একটার পর আরেকটা উদ্দাম ঢেউ এর মত
তুমি কাছে এসো।
বাছবিচার তুলে রেখে
দুহাত বাড়াও আমার কাঁধে।
ঢেউ যেমন করে ভাঙে পৌন:পুনিকতায়।
কেন এত বাছবিচার ?
প্রকৃতির সহজ ছুটে আসার মত
তুমি ও কি আসতে পারো না--
উদ্দাম, উচ্ছৃঙ্খল, বাধাবন্ধনহীন রোমিও'দের মত!
যদি মন সায় না দেয়--
তবে দু-পেগ ভদকা'য় কমে যাবে চিন্তার সাযুজ্য।
এসো, পান করি।
সরিয়েই রাখি সমাজ, সংসার, কলরব।
ডানা মেলো প্রজাপতি
উদ্দাম আবেগে।
এই তো জীবন কালী'দা !
মন যা চায় তাকে কেন সরিয়ে রাখো,
মনের আরেক মনে--
তার চেয়ে গাঢ় অন্ধকার অনেক
অনেক ভাল।
রোদে মাখা সংসার থেকে।
এসো, দু হাত বাড়িয়ে এসো
আমার এই পারিজাত হোটেলের দুশোবাইশ
নম্বর ঘরে।
একবার চুম্বিত হই তোমার আহবানে।
একবার, লতার মতন
জড়াই তোমার শরীরে।
ঘ্রাণ নিই প্রাণ ভরে--
একটু মাটির গন্ধ এখনো লেগে আছে
তোমার নাভিপদ্মে।
আর বাকি সব, হারিয়েই গেছে সেই
ভুবনডাঙার মাঠে।
তুমিই শুধু সত্যি হয়ে আছ --
এই পৃথিবীতে।
সমদ্রের ওজন স্তরে প্রাণ ভরে নিচ্ছি তোমার
গায়ের গন্ধ,
চুড়ির রিনরিন শব্দ শুনছি ঢেউ-এর গর্জনের সাথে।
তোমার ওই অবাক মুখে দেখছি এখনো,
বেঁচে থাকার মানে।।
২৮শে আগষ্ট, ২০১৬
পুরী।
#
ঘরকন্না—
অধিকারবোধে রেখেছি দলিল তৈরী
মেঘলা আকাশ হয়েছিল আজ বৈরী।
সন্ধ্যেবেলায় ভালবাসা ছুঁয়ে হাত—
শপথের তাপে করেছি কিস্তিমাত !
তোমার দুচোখ তখন তারার সাথে
খেলছিল মন নতুন স্বপন পথে।
বাঁধা পড়ছিল কত না ক্লান্ত হাওয়া
পুতুলখেলার স্বপ্নকে কাছে পাওয়া।
দিন থেকে দিনে শরীর ঘোমটা খোলে
মোহনবাঁশীতে রাখালিয়া সুর তোলে—
দূরে চলে যায় কত না টুকরো স্মৃতি,
মনের খেয়ালে থাকে না তো পরিমিতি।
গান ভাসে দূরে—
‘তুমি প্রিয়া আমি প্রিয়’
ফাল্গুন বলে, পলাশের মালা নিও।
সাগর পাঠায় দূর থেকে সে— হাওয়া
তুমি আমি, আর শুধু ‘চাওয়া—পাওয়া’।
তারপর যত দিন যায় যত রাত
ভালবাসা ভাঙে, অধিকার তোলে হাত।
বহতা জীবন কতো না স্রোতের বাঁকে
পলি জমা মন ঘরকন্নার ফাঁকে।
মনে চোরাবালি ফল্গু’র
ধারা পাত
এমন সময়ে কাছে আসে কোনো হাত
সেই হাতে যদি আবার কিশোর বেলা
ফিরে পাওয়া যায়, মন্দ কি ? মিছে খেলা—।
তবু ধেয়ে আসে স্বজন সমাজ নীতি—
ছেঁড়া মনে যদি একটুও জাগে প্রীতি !
গোলাপ তখন কাঁটা ভরা অনুরাগে,
মনের গহনে উজ্জ্বল হয়ে জাগে।
আর কিছু, আছে নাকি বাকি ? বেলাশেষে—
সন্ধ্যা আকাশে কনে দেখা আলো মেশে।
অধিকার যদি প্রেমকেই বাধা দেয়
প্রেম তবে শুধু নিবেদিত বাঙ্ময় ?
২৪শে আগস্ট, ২০১৬
কলকাতা।
(এপার ওপার ইছামতী - বৈশাখ সংখ্যা – ১৪২৪ য় প্রকাশিত)
#
অচেনা—
এত বিষ ছিল মনে মনে—
জানা যে উচিৎ ছিল, তাও মনে ভাবিনি—, কখনো।
শুনেছি সাপের বিষ থলি ভরে গেলে,
অপেক্ষা করে না আর—।
ছোবলেই সাত খুন মাপ।
বোধহীন যুক্তিহীন প্রাণী, তাই—
অত ভীড় নেই মনের ভাঁড়ারে।
নেই অত চিন্তার অগম্ বাসনা !
মানুষের মন—
কে জানিতে পারে আর ? নিজেও কি ?
যুক্তি বুদ্ধি শান দেয় অহরহ ;
সব কিছু জানিবার সব কিছু বুঝিবার—
ভীড়ে, মনের সে ঘরে সাপলুডো খেলা।
ওজন-এর স্তরে ফুটো।
ভাইরাস খেলা করে খোলা মাঠে আর—
মনে জমে ভূপালে’র গ্যাস। কি করে জানবো তা !
পৃথিবী সবুজ হ’লে শুষে নিত সবকিছু।
১৮ই আগস্ট,২০১৬
কলকাতা।
#
ঝরা—শব্দ —
এখন সকাল—।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখছি বারংবার
সবুজ হয়ে থাকা বকুল গাছটার প্রেক্ষাপটে।
তার সাথে শুনছি অবিশ্রাম ঝরা-শব্দ।
তোমার চুড়ি’র রিনরিন আওয়াজ যেমন ছোঁয়
আমার মনটাকে- ঠিক যেন
তেমন।
বকুলের পাতায় পাতায় কি ঝংকারে বৃষ্টিফোঁটাগুলি’র
অবিরল ছুঁয়ে যাওয়া।
আর কতোদিন শুনতে পাবো এ বৃষ্টির শব্দ—
বকুলের পাতায় ?
নগর বাড়ছে—।
১৭ই আগস্ট, ২০১৬
কলকাতা।
#
সং-সার—
কতো দিন ধরে—,
কতো ক্লান্তি জমিয়ে জমিয়ে—
এক অপারগ ভালবাসাহীন সংসার খেলে বেড়াচ্ছে
আমাদের চারপাশে। কিম্বা হয়তো আমার-ই ঘরে !
কতো মন্ত্র কতো ফুল বিকশিত হয়ে
গোড়ে মালা গাঁথে প্রতিদিন নির্জন স্বাক্ষরে।
এক অসম্ভব চক্রান্তে অগুন্তি কুঁড়িগুলো
বাঁধা প’ড়ে সুতোর প্যাঁচে।
তবু সব ফুল ফোটে নাকি ?
এক নির্দয় বোঝাপড়া গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে।
ফুটে ওঠা পাপড়ির গলায় সুতোর ফাঁস—
আর আজীবন বয়ে চলা এক পৌনঃপুনিক পরকীয়া যেন ;
চলতে থাকে— চলতেই থাকে ধারাবাহিকতায়।
এমন কি কথা ছিল ? সেই কবে সবুজ কিম্বা লাল আপেলে’র রসে
ভিজিয়েছিল যারা তাদের গোলাপী ঠোঁট-দুটো—
সেই সূত্র ধরে শকুন্তলা কি পেয়েছিল, তার সেই যৌবনবাহিত স্বপ্নস্বাদ।
অথবা দশাননফেরৎ জনমদুখিনী ?
দু-সন্তানের জননী হয়েও কি পেয়েছিল তার সেই পুতুলখেলার নরম বিছানা— !
দুপুরের খাওয়া হলে যে বৌ’টি চলে যায় পুকুরের পারে,
ছাই আর মাটি ঘষে দাগ তোলা বাসনের মতো—
জীবন কি নয় তার ?
জীবনের কৌণিক নিয়ম মেনে কেন ভাত খাওয়া সবশেষে ?
আবার রাতের বেলা একা একা সেই পুকুরে’র পার !
ঘরে ফিরে অনুভবহীন সন্ধি সমাসের বহতা প্রয়াস।
নিরন্তর বয়ে চলা অন্তহীন ক্রিয়া।
সার দিয়ে সং সেজে এক একটা গনেশজননী।
১১ই আগস্ট,২০১৬
কলকাতা।
ঘুম থেকে তুলে নিয়ে কেউ কখনো ‘ওলা’ চাপাবে !
ওলা চাপা তো হলো ! ফুটপাথের বাসিন্দার স্বপ্নও—
সত্যি হয়ে যায় মাঝে মাঝে।
রোজ সকালে দেখি বাবু আর দিদিরা একটা করে
ওই কাগজ কেনে আর নিয়ে যায় বেশ পাকিয়ে পাকিয়ে।
রামদীনকাকা’র কাছে কত আরো ছবি দেয়া বই থাকে।
আমি তো পড়তে পারিনা তবু জানি, রামদীনকাকা বলে—
আরে, ইসমে খবর রহতা হায় রে বেটি।
রাত হলে দোকান গুটিয়ে বাড়ি যায় কাকা।
শুরু হয় সাপলুডো খেলা।
মা রান্না করেছিল ভাত আর কুমড়োডাঁটা’র তরকারী।
তারপরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিই না।
চ্যাংদোলা। মুখে কাপড় বাধা।
আমি কোনো গাড়িতে। আমার ওপরে একটা ছেলে।
সারা শরীরে কামড়াচ্ছে কিছু। আর কিছু মনে নেই।
কলকাতা খুব ভাল গো দিদিমনিরা, বাবুরা।
আমার মতো রাস্তার মেয়েও ওলা চাপলো !
কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা শরীরটা লাগছিল।
কতো ইচ্ছে হ’ত গো ওই সাদা গাড়িতে চাপার।
রামদীনকাকা—, আমার খবর থাকবে ? কাগজে ?
বাবু আর দিদিমনি’রা অমন করে পাকিয়ে নিয়ে যাবে—
যেমন করে চ্যাংদোলা ?
কলকাতা।
আর
কথা অনর্গল। ব্যাকরণ—,ছূটে ছুটে
রেসকোর্সে’র
ক্লান্ত ঘোড়া। জিরোয় আজকাল।
শব্দ ওড়ে মুখ থেকে মুখে—
অবিরল।
— ডিভিসি’র জল।
মোহ অবনত রিপু।
বড়রাস্তার ধারে কাটা পড়ে মেহগনি।
প্রকৃতির ফোড়া ফাটে—
শব্দরূপ ধাতুরূপ বিশেষ্য বিশেষণ অব্যয় ;
লক্কা পায়রার মতো ওড়ে
চারপাশে।
শোণিত উল্লাসে।
কলকাতা।
বেগে, মাছ আসে ঠোঁটে। কিম্বা ধরা যাক, পরিযায়ী রুট—
লুডো’র ঘুঁটির মতো গন্তব্যগামী। আধুনিক বাইশ ক্যারাট
মাত্রা পায় রক্তকুঁচে। যোগফল সমান সমান।
হুগলী’তে ভেসে গেছে কবে ! ফসল—এর তছরূপ—
সিঙুর পাঁচিলে। বর্গী’তে ধান ছেড়ে ঢেরা দেয় গ্রামে।
উন্নত বাঁধ ভাঙে উন্নত মেশিন। মাছ ফেরে জলে—
গাছে ফেরে পাখি। পরিণত মাছরাঙা উড়ে যায় বেগে।
তীব্র আবেগে।
কলকাতা।
তোমার ঠোঁটের কাঁপন যেন বিকেল রোদে জ্বলে—
আমি তখন তোমার পাশে আমের বউল মেখে
গন্ধ নেব তোমার বুকের গহন খাঁজের থেকে।
সারা শরীর জুড়ে তোমার নামবে বাদল বেলা
একটু না হয় অসংগত,করবো অনেক খেলা।
ঘন মেঘের আওয়াজ ছেয়ে আকাশ হবে কালো
তোমার ছুটি আমার বুকে হঠাৎ করেই আলো।
উন্মনা মন দুজনের’ই এমন করেই বাঁচে।
না হয় তোমার অন্য ঘরে বাঁচার রসদ পাকা
একটুখানি সহজ হলেই পটের ছবি আঁকা।
এসো না হয় সময় হলে মিটিয়ে যত কাজ
তোমায় না হয় পরিয়ে দেব আমার যত সাজ।
কলকাতা।
(মায়াজম - কলকাতা বইমেলা সংখ্যা ২০১৮ য় প্রকাশিত)
সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে সাদা ফেনার মত
একটার পর আরেকটা উদ্দাম ঢেউ এর মত
তুমি কাছে এসো।
বাছবিচার তুলে রেখে
দুহাত বাড়াও আমার কাঁধে।
ঢেউ যেমন করে ভাঙে পৌন:পুনিকতায়।
প্রকৃতির সহজ ছুটে আসার মত
তুমি ও কি আসতে পারো না--
উদ্দাম, উচ্ছৃঙ্খল, বাধাবন্ধনহীন রোমিও'দের মত!
তবে দু-পেগ ভদকা'য় কমে যাবে চিন্তার সাযুজ্য।
এসো, পান করি।
সরিয়েই রাখি সমাজ, সংসার, কলরব।
ডানা মেলো প্রজাপতি
উদ্দাম আবেগে।
মন যা চায় তাকে কেন সরিয়ে রাখো,
মনের আরেক মনে--
তার চেয়ে গাঢ় অন্ধকার অনেক
অনেক ভাল।
রোদে মাখা সংসার থেকে।
আমার এই পারিজাত হোটেলের দুশোবাইশ
নম্বর ঘরে।
একবার চুম্বিত হই তোমার আহবানে।
একবার, লতার মতন
জড়াই তোমার শরীরে।
ঘ্রাণ নিই প্রাণ ভরে--
একটু মাটির গন্ধ এখনো লেগে আছে
তোমার নাভিপদ্মে।
আর বাকি সব, হারিয়েই গেছে সেই
ভুবনডাঙার মাঠে।
এই পৃথিবীতে।
সমদ্রের ওজন স্তরে প্রাণ ভরে নিচ্ছি তোমার
গায়ের গন্ধ,
চুড়ির রিনরিন শব্দ শুনছি ঢেউ-এর গর্জনের সাথে।
তোমার ওই অবাক মুখে দেখছি এখনো,
বেঁচে থাকার মানে।।
পুরী।
মেঘলা আকাশ হয়েছিল আজ বৈরী।
সন্ধ্যেবেলায় ভালবাসা ছুঁয়ে হাত—
শপথের তাপে করেছি কিস্তিমাত !
খেলছিল মন নতুন স্বপন পথে।
বাঁধা পড়ছিল কত না ক্লান্ত হাওয়া
পুতুলখেলার স্বপ্নকে কাছে পাওয়া।
মোহনবাঁশীতে রাখালিয়া সুর তোলে—
দূরে চলে যায় কত না টুকরো স্মৃতি,
মনের খেয়ালে থাকে না তো পরিমিতি।
ফাল্গুন বলে, পলাশের মালা নিও।
সাগর পাঠায় দূর থেকে সে— হাওয়া
তুমি আমি, আর শুধু ‘চাওয়া—পাওয়া’।
ভালবাসা ভাঙে, অধিকার তোলে হাত।
বহতা জীবন কতো না স্রোতের বাঁকে
পলি জমা মন ঘরকন্নার ফাঁকে।
এমন সময়ে কাছে আসে কোনো হাত
সেই হাতে যদি আবার কিশোর বেলা
ফিরে পাওয়া যায়, মন্দ কি ? মিছে খেলা—।
ছেঁড়া মনে যদি একটুও জাগে প্রীতি !
গোলাপ তখন কাঁটা ভরা অনুরাগে,
মনের গহনে উজ্জ্বল হয়ে জাগে।
সন্ধ্যা আকাশে কনে দেখা আলো মেশে।
অধিকার যদি প্রেমকেই বাধা দেয়
প্রেম তবে শুধু নিবেদিত বাঙ্ময় ?
কলকাতা।
(এপার ওপার ইছামতী - বৈশাখ সংখ্যা – ১৪২৪ য় প্রকাশিত)
জানা যে উচিৎ ছিল, তাও মনে ভাবিনি—, কখনো।
শুনেছি সাপের বিষ থলি ভরে গেলে,
অপেক্ষা করে না আর—।
ছোবলেই সাত খুন মাপ।
বোধহীন যুক্তিহীন প্রাণী, তাই—
অত ভীড় নেই মনের ভাঁড়ারে।
নেই অত চিন্তার অগম্ বাসনা !
মানুষের মন—
কে জানিতে পারে আর ? নিজেও কি ?
যুক্তি বুদ্ধি শান দেয় অহরহ ;
সব কিছু জানিবার সব কিছু বুঝিবার—
ভীড়ে, মনের সে ঘরে সাপলুডো খেলা।
ভাইরাস খেলা করে খোলা মাঠে আর—
মনে জমে ভূপালে’র গ্যাস। কি করে জানবো তা !
পৃথিবী সবুজ হ’লে শুষে নিত সবকিছু।
কলকাতা।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখছি বারংবার
সবুজ হয়ে থাকা বকুল গাছটার প্রেক্ষাপটে।
তার সাথে শুনছি অবিশ্রাম ঝরা-শব্দ।
তোমার চুড়ি’র রিনরিন আওয়াজ যেমন ছোঁয়
আমার মনটাকে- ঠিক যেন
তেমন।
বকুলের পাতায় পাতায় কি ঝংকারে বৃষ্টিফোঁটাগুলি’র
অবিরল ছুঁয়ে যাওয়া।
বকুলের পাতায় ?
নগর বাড়ছে—।
কলকাতা।
এক অপারগ ভালবাসাহীন সংসার খেলে বেড়াচ্ছে
আমাদের চারপাশে। কিম্বা হয়তো আমার-ই ঘরে !
কতো মন্ত্র কতো ফুল বিকশিত হয়ে
গোড়ে মালা গাঁথে প্রতিদিন নির্জন স্বাক্ষরে।
এক অসম্ভব চক্রান্তে অগুন্তি কুঁড়িগুলো
বাঁধা প’ড়ে সুতোর প্যাঁচে।
তবু সব ফুল ফোটে নাকি ?
এক নির্দয় বোঝাপড়া গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে।
ফুটে ওঠা পাপড়ির গলায় সুতোর ফাঁস—
আর আজীবন বয়ে চলা এক পৌনঃপুনিক পরকীয়া যেন ;
চলতে থাকে— চলতেই থাকে ধারাবাহিকতায়।
ভিজিয়েছিল যারা তাদের গোলাপী ঠোঁট-দুটো—
সেই সূত্র ধরে শকুন্তলা কি পেয়েছিল, তার সেই যৌবনবাহিত স্বপ্নস্বাদ।
অথবা দশাননফেরৎ জনমদুখিনী ?
দু-সন্তানের জননী হয়েও কি পেয়েছিল তার সেই পুতুলখেলার নরম বিছানা— !
দুপুরের খাওয়া হলে যে বৌ’টি চলে যায় পুকুরের পারে,
ছাই আর মাটি ঘষে দাগ তোলা বাসনের মতো—
জীবন কি নয় তার ?
জীবনের কৌণিক নিয়ম মেনে কেন ভাত খাওয়া সবশেষে ?
আবার রাতের বেলা একা একা সেই পুকুরে’র পার !
ঘরে ফিরে অনুভবহীন সন্ধি সমাসের বহতা প্রয়াস।
নিরন্তর বয়ে চলা অন্তহীন ক্রিয়া।
কলকাতা।
#
ক্ষিধে—
মাঝে মাঝেই প্রেম পায় খুব।
লবটুলিয়া বইহারের যুগলপ্রসাদের যা—
রোজই পেত ! ফুল ফোটানোর তাগিদে—।
আমার তেমন করেই পায়।
তবে শুধু গাছে নয়, মনে—
প্রেম পেলে, শব্দগুলো অবিরল এসে যায়।
কবিতা তৈরী হয়ে ওঠে,
শব্দরা কুঁড়ি থেকে কেমন তরতরিয়ে ফুল হয়ে যায়,
কবিতায়।
বুঝতে পারি আমার অন্তর্গত রক্তের প্রবাহ-
কি অদ্ভুত ছুটোছুটি শুরু করে দেয়
শরীরের আনাচে কানাচে।
আর মনটা তখন বিকেলের কনে-দেখা-আলো’র মত
ছড়িয়ে যায় দিগন্তের দিকে।
প্রেম পায় খুব।
আর মনে হয় বারংবার, যে—
খানিকটা দারু পান করে নিয়ে বুঁদ হয়ে যাই।
অনায়াসে অক্লেশে।
কিন্তু পারি না।
পারি না সত্যিকারের প্রেমে মানুষ হয়ে উঠতে !
১০ই আগস্ট, ২০১৬
কলকাতা।
#
কথামালা—
আঁধার নেমেছে আজ, প্রিয় কবি—,
লেখা কথা ফলে গেছে আজ ;
ধামাচাপা প্রকৌশলে, আরো কতো ফিকিরফন্দি কৌশলে মাপা।
বন্ধুরা ভালুক খোঁজে, যদি কিছু কথা পেটকাটি ভোকাট্টায়—
উড়ে উড়ে চলে যায় ! তারপরে ভাবা যাবে পদ্ম ফোটে কি না
রেল লাইনের ঝিলে, অসংখ্য বেওয়ারিশ কচুরিপানা
যেইখানে আনমনে, বেগুনী—বেগুনী ফুলে কম্পাস কাঁপায়।
শকুনেরা মিশে গেছে নগর বন্দর ছুঁয়ে ক্ষমতার ভীড়ে।
উড়ে এসে খায় নাকো ভাগাড়ে’র পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট জঞ্জাল,
জঞ্জাল বানায় তারা,ক্লাব বা পার্টি’তে, ভাঙা আয়নায় কিম্বা
বোতলে বোতল ভেঙে। দল বাঁধা পেঙ্গুইন-সত্যিই আকাল।
ভূতেদের লম্বা হাত পৌঁছে যায় লাল রঙা বাজারে’র দিকে—
অথবা নন্দন ঘুরে, নতুন গোলায় গিয়ে; রঙ হয় ফিকে।
২৯শে জুলাই,২০১৬
কলকাতা
#
বন্ধু—
এই ছেলেটা, কোথায় গেলি তুই
মা যে তোকে চাইছে বারংবার
সেই যে গেলি, ফিরছিস না কেন !
তুই না এলে বাড়ি-ই অন্ধকার।
বন্ধু’রা
তোর এতই যদি ভাল— !
তারা কেন ভেতর ভেতর চুপ ?
তুই কি তবে পাকা ধানের মই—
নাকি অপেক্ষাতে ?হাতে নিয়ে ধূপ ?
বন্ধু কথা’র
মানে জানিস তুই ?
জানে কি তোর প্রাণে’র বন্ধু যারা ?
বন্ধু মানে দোসর,স্বজন,সাথী,
আড়ি-ভাবে’র,সময় পাবে তারা ?
হাওয়া এখন বড্ড বেশী ভারী—
শোনা কি যায় ?রাতের কড়া নাড়া—
বাড়ি এখন বন্দী ফ্ল্যাটের ঘরে,
হারিয়ে গেছে রাতের য’ত পাড়া।
সন্ধ্যে বেলা হাজার পার্টি’র
ভিড়
বোতল-গেলাস্ গড়াগড়ি যায়—
নেশা যখন মাথায় চ’ড়ে বসে
বন্ধু’কে কি চিন্তে পারা যায় ?
জেঠা,কাকা কেউ তো বকার নেই—
মানিক সোনা আরো আদর চায়,
বকতে গেলে আইন আসে তেড়ে ;
এমনি করে আদর বেড়ে যায় !
এই ছেলেটা,আয় না ফিরে তুই
নয় তো জানা কোথায় পাবো তোকে ?
বাঁশ বাগানের মাথার ওপর—
হারিয়ে গেলি ? কি বলি তোর মা’কে ?
সাথী’রা
তোর,কাপড়ে মুখ বেঁধে
ঘুরছে নাকি ? এ শহরের বুকে— ।
তোর তো তারা বন্ধু বলেই জানি,
পারছে তারা ? বসতে,খেতে শুতে ?
এমন করে এরাই বড়ো হবে—
?
আমাদের কি নেইকো কোনো দায় !
আরো কত আদর দিয়েই,শেষে
‘বন্ধু’ মানেও পাল্টে দেওয়া যায় !
২৫শে জুলাই,২০১৬
কলকাতা
#
বিকেল—
জলপাই-এর পাতায় পাতায় বিকেলের নিরুদ্বেগ অন্ধকার নামে—
দূর— আরো দূর থেকে,ধূসর আলো’র ঘ্রাণে,
পাখীদের ঘরে ফেরা—
বিকেল আর সন্ধ্যের সঙ্গমে আকাশের রঙ খেলা করে যায়,
জলপাই-এর পাতায় পাতায়,
যেন কোনো এক,অকারণ সহজতায় !
তাড়া নেই তার,তাড়া নেই সবকিছু চিন্তার -
অগুন্তি কুঞ্চিত কপাল-রেখায়।
বিকেলের প্রসাধন ফুরায় না তার।
রাশি রাশি পাটক্ষেত,এক হাঁটু জলে—
আনমনে বেড়ে ওঠে নিজের’ই খেয়ালে,
পাশাপাশি মাথা তুলে !
এক মাপে বেড়ে ওঠা দিগন্তের অসীম বিস্তারে—।
এক গালে আলো পড়া সাদা কালো ছবি ;
বাকি আধে—,অন্ধকার খেলা করে—
বেহুঁস চিন্তার রঙ যতক্ষণ গুহার ভেতরে !
২৪শে জুলাই,২০১৬
কলকাতা
#
নতুন বিস্ময়—
হিজলের ফুল ঝরে পড়ে অবিরল।
খঞ্জনা নেই আর— শ্যামা গান গায় নাকো !
জামফুল থোকা হয়ে ফুটে থাকে সবুজ আড়ালে—
একরাশ গন্ধ নিয়ে শুধু—।
একরাশ গন্ধ নিয়ে—
কতোদিন অপেক্ষা করে রয় জামফল,ছোট ঠোঁট ঠোকরাবে বলে।
টুনটুনি দোয়েলের ওড়াউড়ি কাঁপায় না আর
সবুজ পাতার ভীড়।
হিজলের ফুল ঝরে পড়ে— ঝরে পড়ে অবিরল—
শালিখের ডানা বেয়ে ঘাসে ভেজা বাঙলার সবুজ প্রান্তরে।
রূপসা’র
ঘোলা জল ঢেকে গেছে কচুরীপানার ভীড়ে।
স্রোত নেই আর।
কচুরীপানার ফুলে ভ’রে থাকে নদী,
ডিঙিরা’ও ভেসে চলে গেছে সেই সদাগর সাথে।
কিশোরেরা শিখে গেছে লাল নীল সবুজের নানা কোলাহল।
শিখে গেছে মিথ্যের ফুলঝুরি কেমন বর্ণিল হয়ে ফোটে।
চাল ধোওয়া স্নিদ্ধ হাত ভুলে গেছে নিতে
ক্ষেতের চালের গন্ধ—
কোলাহল বেড়ে গেছে ঢের— ।
এসেছে কৌরব-কূল নতুন প্রশ্রয়ে,
আরো কিছু বিকলাঙ্গ জন্ম দেবে বলে।
২১শে জুলাই,২০১৬
কলকাতা
#
দোপাটি—
খুব ইচ্ছে করে—
জলের ফোঁটা লেগে থাকা দোপাটি’র পাপড়ি’কে
আলতো করে দুহাতে ধরি।
তারপরে দুঠোঁট ভিজিয়ে পরম আশ্লেষে শুষে নিই
গর্ভকেশরের মাঝে জমে থাকা বৃষ্টির জল।
বৃতি’র আলগা স্পর্শে শিহরিত হয়ে উঠুক—
আমার নাকের দুই-পাশ।
দুগালে মাখাই,উদ্ধত পরাগরেণুর খসে পড়া রঙ।
শ্বাস নিই পরিপূর্ণ হৃদয়ে,যাতে মিশে আছে
পৃথিবীর সব গন্ধ –
যে গন্ধ জীবনের,যে গন্ধ সত্যি’র।
তারপর জীবনের সব রস টেনে নিয়ে
ফলের রসালো আস্বাদ আর
কামড়ানো বীজে’র ভীড়ে আবর্জনা-স্তূপ।
চুম্বন ভেসে যায় আর্সেনিক-জলে !
১৯শে জুলাই,২০১৬
কলকাতা
#
একটু নীরবতা—
শহর ভাসে স্বর—বন্যায়—।
উচ্চকিত ভাষা’র বর্ণমালায়—
এতো জঞ্জাল, যে—
রোজ লাগে কানখুস্কি।
দশদিকথেকেইসারাক্ষণ ধেয়ে আসে শব্দচাক।
তার সাথে ফাউ মেলে একদলা নিষ্ঠিবন,
কচিৎ কদাচিৎ।
শহর ভাসে প্রাণবন্যায় !
পাখীর ডাক শোনার জন্য যে মন আকুল—
ঝর্ণার আছাড়ি-পিছাড়ি উল্লাসে যে মন মাতাল—
ঘরে ফেরা হাঁসের চই-চই এর মিষ্টি সুর
এমন কি দূরে ভেসে আসা রেল-গাড়ির ঝিক-ঝিক,
এসব তো কবে থেকে নেচে যায়—, হৃদকমলে।
একদিকে আবিস্কারের জয়যাত্রা,
অন্যদিকে কুফলী মানুষ।
শিক্ষা আনে চেতনা আর
চেতনা আনে বিপ্লব।
টাকা আনে ক্ষমতা আর
ক্ষমতা আনে মর্জি।
নিজেকে চেনাতে হয় তাই—
বিভিন্ন মাপের সাইনবোর্ডে।
আর প্রতিদিন
অসাড় হয়,মননের মধু।
তবুও তো প্রজাপতি ওড়ে !
গাছে আসে কচি পাতা।
মাটি পেলেই জন্মায় ঘাস !
কোন সে মন্ত্রে ?
দাও ফিরে সে মন্ত্র—
আমার শহরে নামুক
একটু নীরবতা !
১৪ই জুলাই, ২০১৬
কলকাতা
#
আনো প্রেম—
মেঘে মেঘে যদি আলো ঢেকে দেয়—
পারবে কি কাছে আসতে ?
দূরের আকাশে বাজ যদি ভাঙে
পারবে কি ভাল-বাসতে ?
বর্ষা এখনো ভিজে হাওয়াটাকে
ভালবেসে ছেড়ে দেয় নি—
তাই যত মেঘ জলের আভাস,
খুঁজে ফেরে,তবু পায় নি।
আমি যদি চাই তোমার চোখেতে
আন্তেই পারি বৃষ্টি,
সে জলের টানভালবাসাময়—
চকিতে শ্রাবণ সৃষ্টি।
তোমার আমার মিলিত আবেগে
গাছে গাছে চাঁপা ফুটবে,
কদম তলায় উদাস বাঁশীটি
সুরে সুরে ফুটে উঠবে।
শুধু একবার, ছুটে এসো তুমি
আমার চোখেতে তাকিয়ে—
বর্ষা দেখবে—, ঠিক আসবেই
তোমার বুকেতে— ঝাঁপিয়ে।
জানি আমি জানি, ভালবাসা পারে
যতো সব কিছু মেলাতে—
তাই আমি শুধু ভালবাসাচাই,
অবোধ মন’কেচেনাতে।
চারপাশ আজ ভালবাসাহীন
শুধুই আগুন জ্বলছে—
এমন কথা কি কেউ ভেবেছিল
প্রেম কেঁদে ফিরে চলছে ?
এসো আরো কাছে, বর্ষা নামাতে ;
আমার বুকেতে ঝাঁপিয়ে—
আকাশে আসুক জল-ভরা মেঘ
তোমার দিকে’তে তাকিয়ে।
এত হানাহানি এত রাগ সব—
গলে যাক ভেজা জলে’তে
সাহারা মনে’র যতো কালো দ্বেষ,
ফিরে পাক প্রেমে— আলোতে।।
১৩ই জুলাই, ২০১৬
কলকাতা
#
চলো পালাই—
চলো—
নরকেও যদি নিয়ে যেতে চাও,
আপত্তি করবো না।
এ পৃথিবীর সব-কিছু পাথর—ও হজম হয়ে গেছে।
তাই আর ভাবিনা কিছুই।
কারণ তুমি তো জ্যান্ত, মিথ্যে তো নও !
সামনে আটা’র জিলিপি ঝুলছে—
মোটা সূতোয় !
তার চেয়ে মনে হয় নরকেই যাওয়া ভালো।
তবুও তো মুক্তি !
মিথ্যের চেয়ে যা লক্ষগুণ বাস্তব।
দৌড়ের গতিপথে মোক্ষ চাই !
অনায়াসে পেতে চাই সেই গুহা-দরজায় প্রবেশের অধিকার।
মন্ত্র যেন মুখস্থ হয়ে গেছে—
পাল্টায়নি, পাল্টাচ্ছেনা, পাল্টাবেনা যেন আর !
যেন বাবুই পাখির বাসা।
তাই চলো—তোমার
হাত ধরেই—
নরকের রাস্তা’র দিকে এগিয়ে পড়ি।
তাতে অন্ততঃ মেকি আর মুখোশের থেকে বাঁচবো।
একটাই জীবন যখন—
কি লাভ আর ?
মিথ্যের তুলি’তে কবিতার ক্যানভাস এঁকে চলা ?
৮ই জুলাই, ২০১৬
#
একগন্ডা -
এমন অমোঘ টানে ফেটে পড়ে ভূমি।
আমি তো কোন ছার !
এক গন্ডা বর্ণ, লন্ডভন্ড করে দিতে পারে সব-।
সে শব্দের টানে সবুজ মাথা তোলে পাতা
জলে আসে জোয়ারের কল্লোল।
আর,
নামে শ্রাবণ যে কোনো সময়েই।
এমন কেন হয় !
শিরদাঁড়া বেয়ে কেন উঠে আসে প্রাণস্পর্শী রক্ত-হিল্লোল।
কেনই বা সন্ধি’তে সন্ধি’তে ধামসা-মাদল ?
রাতজাগা দুপুরে কেন শোনা যায় বাজপাখীর সুতীব্র চিৎকার !
একেই কি বলে আয়োজন –
নতুন রাগে’র ?
৩০শে জুন, ২০১৬
#
তর্পণ -
ছোট্ট কচি হাত-দুখানি তোমার স্পর্শ মেখে
এ-হাত ও-হাত ঘুরেই যেতো স্বপ্নমাখা চোখে।
হয়তো আবার কাঁধের দুপাশ আমার দুটো-পা
হাত-দুখানায় চুলের মুঠি, আকাশ দূরে যা-।
ভোর না হতেই মায়ের তাড়া, তুমি তখন চুপ,
এদিক ওদিক শুকনো মুখে নির্বাক নিশ্চুপ।
কিছুটা পথ যেতে যেতেই ঘন্টা শোনা গেলে
চলার ছন্দ দ্রুত আরো, কাঁধের ওপর ছেলে।
স্কুল গেটটা এগিয়ে আসে বুকের ভেতর জ্বালা
আবার কখন পাবো ছুটি ঘরে ফেরার পালা।
আসার পথে কত রকম লোকের সাথে দেখা
তোমার চোখে সর্ষেফুলের হলুদ গন্ধ মাখা।
আমি তখন রাজপুত্তুর হাতে স্কুলের ব্যাগ –
রামধনু রঙ চারিদিকেই মনেতে জেট-ল্যাগ।
আবার পাওয়া পরের দিনের সূর্য ওঠা ভোরে,
বাকি সময় অন্য লোকে নেয় যে আমায় কেড়ে।
আবার রাতে পাশে শোওয়া এক পা বুকে তুলে-
ঘুম এসে যায় দু-চোখেতেই ঘুমিয়ে পড়ি ভুলে।
এমনি করেইকেটে গেল আমার ছেলেবেলা
আমার ছেলে ফিরিয়ে দিল সেসব স্মৃতি’র মালা।
যেদিন ছেলে পা তুললো আমার বুকের মাঝে -
তখন শুনি পাগলা সানাই দূরে কোথাও বাজে।
১৯শে জুন, ২০১৬
#
জানলা -
হোটেলের ঘরে শুধু একদিকেই জানলা।
সামনের রাস্তার ওপারের উঁচু বাড়িটা -
চোখ আর কাঞ্চনজঙ্ঘা'র মাঝে
চীনের প্রাচীর যেন।
বর্ষার ছন্নছাড়া মেঘগুলো,
জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে ঘরে।
পালাবার পথ নেই আর, আর তাই-
জামাকাপড়, গামছা-মোজা, চাদর-বালিশেই
মাখামাখি করে মিশে যাওয়া।
মেঘের গন্ধ মাখা বালিশে কারা যেন খেলা করে!
শুধুই খেলা করে
আমাদের অর্জিত আধুনিক চিন্তার মতো।
অথবা -
সেই জালিয়ানওয়ালাবাগের একটাই পথের মতো।
বেরোনোর পথ নেই আর।
চিন্তার স্বপ্নগুলো তেমনি করেই কি -
মিশে যাচ্ছে আমাদের চাদর-বালিশের সাথে ?
অন্য জানলাটা না থাকায় -।
গৌতম দত্ত
১২ই জুন, ২০১৬
#
নতুন নগরে -
মাঝরাত ফিসফিস, শুনশান চারদিক,
গাড়িতেই হুল্লোড়, পেটে নেশা কিঞ্চিৎ -
ফাঁকা ফাঁকা পথঘাট, গাছপালা দুলছেই ;
নিয়নের ছায়াতেই দেখে চোখ্ চিত্তির।
একলাটি হেঁটে আসে দূর থেকে স্পষ্ট -
উইন্ডস্ক্রীনেতে লোভ তলপেটে কষ্ট !
জিভে জল চুক্চুক্ নিঃশ্বাস বন্ধ,
আরো কাছে আসতেই উউফ্ কি আনন্দ!
অবয়ব স্পষ্ট টি’শার্টটা
দেখা যায় ;
জিন্সের ট্রাউজারে গুটি গুটি পা’য় পা’য় -
রঙ বোঝা মুশকিল্ ঝিকুমিকু আঁধারে,
মনে হয় খুবই কচি মন নাচে বাহারে !
সামনেই প্রজাপতি মাকড়সা আট ঠ্যাং -
খপ করে টেনে নিয়ে চলল ড্যাডাং ড্যাং ;
ফাঁকা পীচ রাস্তায় নতুন দিনের শুরু,
পেছনেতে প্রজাপতি ছিঁড়ে খায় গ্যাংগুরু।
মাকড়সা তিনখানি সামনের বইঠায় -
লোভে প্যান্ট চটচটে পেছনেতে শুধু চায়,
পূজো শেষ করে গুরু সামনেতে টপকায়
পালা করে মাকড়সা প্রজাপতি চটকায়।
শহরের পেয়াদা’রা
গাড়ি চেপে লরী খোঁজে
ছোটখাটো বিস্ময় চোখে আর পড়ে না যে।
লরী ধরে নজরানা ভাগাভাগি বখেড়ায়,
মাঝ রাত লজ্জায় কত পাপ দেখে যায়।
পালা শেষ হয়ে আসে প্রজাপতি রাস্তায় ;
পাখা তার ভাঙাচোরা নড়াচড়া করা দায়।
ভোর হয় শহরেতে চলাচল ভীড় বাড়ে -
প্রজাপতি মুখ গুঁজে থুবড়েই এক ধারে।
মাকড়সা বাড়ছেই পেয়াদারা চুপচাপ,
প্রজাপতি পাখনায় আজ শুধু সাদা ছাপ।
কলকাতা বেঁচে নাকি বাড়ি ঘর উঁচু তার -
মাকড়সা জাল বোনে চারদিক ছারখার।
রাজা আসে রাজা যায় পত্তন নতুনের।
ঢাল ছাড়া নিধিরাম চোখ পড়ে শকুনের।
শকুন মাংস খোঁজে প্রজাপতি রঙ চায় -
শহরটা ঢেকে গেছে শীতঘুমে কুয়াশায়।।
২রা জুন, ২০১৬
#
মানে -
রাতের খাবার সময় চোখ থাকে টিভি স্ক্রীনে।
বাঙলা শব্দগুলো তখন রামধনু –
শব্দের মালা কিছুতেই মনে গাঁথা যায় না।
কচ্কচানি আর বিজ্ঞাপনের মিলমিশে
এক অপূর্ব যন্ত্রের চাকর হয়ে যাচ্ছি,
দিন কে দিন।
রুটি খাই রাতে –
যে দিন যা তরকারী জোটে গিন্নির পরিবেশনে,
চুপচাপ খেয়ে নি।
আর চুপচাপ করে দেখে যাই –
নেতাদের ঝগড়া, বুদ্ধিজীবীদের হিতোপদেশ, মন্ত্রীমশাইদের বাহানা -
আরো কতো কিছু।
তরকারীটা যেদিন সত্যি সত্যিই ভাল হয় –
তখন মনে হয় সত্যি তো ! সব তো সত্যি কথা !
আর যেদিন শুধু ঢ্যাঁড়শের ফাইবার দাঁতে আটকায় –
সেদিন মনে হয় যেন কিছু শব্দের অর্থ পাল্টে গেছে।
সাম্প্রদায়িক বা ধর্ম-নিরপেক্ষ ইত্যাদি ইত্যাদি।
আর যেদিন -
কখনো মসৃন, তো কখনো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে চেবানোর প্রক্রিয়া।
খেতে খেতে তো আর টুথপীক দেওয়া যায় না !
কিন্তু যাই হোক না কেন – গিল্তেই হয় সব।
তারপরে মুখ ধোয়া আর টিভি বন্ধের ঘোষনা –
মশারী ফেলার তোড়জোড় !
ঘুম আসে না –
চৈতন্য মহাপ্রভুর কথা ভাসে মনে।
তিনি তো সাম্প্রদায়িক-ই ছিলেন তার মতে।
ধর্ম-নিরপেক্ষ ছিলেন কি ?
বুঝতে পারি না মোটা মাথায়।
কাল একবার জিজ্ঞেস করতে হবে –
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলি।
কিন্তু, কাকে জিজ্ঞেস করি ?
ভাবতে থাকি আমাদের ভাগ গুলো।
কেউ অ-সাম্প্রদায়িক আর ধর্ম-নিরপেক্ষ।
কেউ সাম্প্রদায়িক আর ধর্ম-নিরপেক্ষ।
কেউ অ-সাম্প্রদায়িক আর ধর্ম-সাপেক্ষ।
কেউ সাম্প্রদায়িক আর ধর্ম-সাপেক্ষ।
এছাড়া কি আর কিছু বাকি পড়লো ?
ধর্ম আর সম্প্রদায় ছাড়া আর কি কেউ পড়ে রইল নাকি ?
ঘুম আসছে চোখে –
দেখি, স্বপ্নের অতিথিরা কি বলে আজ !
১লা জুন, ২০১৬
#
রাজনীতি -
ওপরেতে চলে রঙ মেলানো’র
খেলা -
নীচেতে যখন চরম দুর্বিপাক।
অধিকার নাকি জোর করে গাছে ফলে
চুপি চুপি তাই আলাদা আলাদা কথা।
এমন দুপুরে ঝাঁক ঝাঁক কথা ঘোরে
আধো ঘুমে তাই কল্পিত ডায়াগ্রাম।
বাকি থাকে শুধু তেলে জলে মিল দেখা,
যে তেল শুধুই জ্বলা ছাড়া বাকি স’বে।
এমন সময় দেখেছি স্বপ্নে ঢের –
ইতিহাস পায় রূপকথা নামাবলী।
পক্ষের ভারে ঈগলেও টাল খায় –
আমরা তো তবু মনু’র রক্তে ঋণী।
কাক-শালিখেতে ঠোকাঠুকি দেখি বেশ
মনের প্রহরে গুণ-ভাগ-যোগ খেলা।
হঠাৎ চম্কে পার্থ গুরুকে ডাকে -
বুড়ো আঙুলেই বিচারের বাণী কাঁদে।
রংচঙে প্রথা যুগ থেকে যুগে ফেরে –
কলি’র বিকেলে কেতনের রঙে ভাগ।
মামা-ভাগ্নেতে দুধভাত খায় বেশ –
জ্বলজ্বল চোখে আধপেটা খেয়ে বাঁচা।
গনগনে রাগ বুকের ভেতরে জ্বালা -
সূতপুত্রও দলে যোগ দিলে উল্লাসধ্বনি ওঠে।
আদ্ধেক কথা পেটের মধ্যে চিরকাল অক্ষয় –
রাজনীতি তাই কুটিল চতুর অঙ্ক মেলানো যোগ।
নামবে সন্ধ্যা সরস্বতী তীরে যবে –
অহং বোধের বন্যা তখন নিশ্চিত শুয়ে রবে।
২৬শে মে, ২০১৬
(এপার ওপার ইছামতী -আত্মপ্রকাশ সংখ্যা – ১৪২৩ এবং খোয়াবনামা পত্রিকায় প্রকাশিত)
#
সবুজ কুঁড়ি -*
আশি টাকা কিলো লিচু খেতে খেতে
জানলার কাঁচ দিয়ে দেখছিলাম রোদের আঁচ।
দুপুর এখন –
আর একটু পরেই বিকেল আসবে বাইরের বারান্দায়।
ঘরের ভেতর যদিও কুড়িতে চলছে তাপমাত্রা’র পারা
তাও মিষ্টি লিচুগুলো’র খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে –
ডান হাতের বুড়ো আঙুলে’র নখে বেশ ব্যথাই লাগে।
তার সাথে,
ট্যাবটা আজকাল খুব ধীরে চলছে কেন বোঝা দায় !
ফেসবুকের পাতা থেকে পাতায় যেতে দীর্ঘ সময়।
মন খুব অস্থির, নানান পরীক্ষার ফলাফলে।
কত কি করার ছিল, কত কি বলার ছিল যেন -।
কাকেই বা বলি যে এই প্রবীন বয়সেও উত্তাপ এনে দেয় –
কিছু কবিতা, কিছু ছবি আর কিছু চটুল রচনা।
হাতের মুঠোয় সারা বিশ্ব আজ –
কালী’দাস থেকে সানি লিওন যাকেই যখন চাই ভালোবেসে,
সবাই হাজির হয়ে পড়ে আট ইঞ্চির এই ট্যাবটায়।
হলুদ কাগজে মোড়া
কলেজ জীবনের ফুটপাথে রাখা সেই কোকশাস্ত্রের বইগুলো,
আর চোখে পড়ে না এই শহর কলকাতায়।
এখন গুগুলে, চটি লিখলেই তামাম শাস্ত্র হাজির এক নিমেষে।
যদিও লজ্জা করে এখন সেগুলো পড়তে তবুও -
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সেগুলো খুলে,ঠিক করে দিই বাংলা বানানগুলো।
কিন্তু পারি না।
অনেক কিছুই পারি না আর।
হাত তুলে চেঁচামেচি করতে গেলেই বুক ধক্ধক্ করে।
তার চেয়ে এই আছি বেশ।
জ্ঞানে অজ্ঞানে যাপিত জীবন।
চালাক আর চালাকির মেকি মুখোশ – বেশ লাগে।
ভাল লাগে এই ফেসবুক এর কথার মারপ্যাঁচ্ -
ভাল লাগে খবরের চ্যানেলে চ্যানেলে সারা সন্ধ্যে কাটাতে –
কত কি জানতে পারি আজকাল।
দরকারে ঘরের তাপমান কমা-বাড়া করি রিমোট যন্তরে।
আজ শুনি আর কাল সকালেই হাটাঁর পরে চায়ের দোকানে,
যোগ দিই আলোচনায়।
এখন সীমা আমার এইটুকুই।
ফ্ল্যাটের দরজা থেকে খুব জোর বড়রাস্তার মোড়।
তারপরে বাড়ি ফিরে গিন্নি’র হাতে অসহায় আত্মসমর্পন।
বই’তে
পড়েছি ডাঃ নর্মান বেথুন, মহান চীনের চেয়ারম্যানকে
বলেছিলেন – ‘আপনি আমায় মেশিনগানের মতো করে ব্যবহার করুন।’
আরো বলেছিলেন, সেই পাগলা ডাক্তারে –
‘রুগী আসবে না ডাক্তারখানায়। ডাক্তারকে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে -,
দেখে নিতে হবে রুগী আছে কোন বাড়িতে।’
কেমন যেন লাগেনা কথাগুলো ?
এই গরমের দুপুর–বিকেলের মাঝে,ঠান্ডা ঘরে বসে এগুলো পড়তে পড়তে,
পৌঁছে যাই সেই যুদ্ধক্ষেত্রে।
যেখানে পরের পর ডাঃ বেথুন খোলা জায়গায় বানানো তাঁবুতে,করে চলেছেন
পঞ্চাশ, ষাট কিংবা আশিখানা অপারেশন, এক দিনে !
আর চোখমুখ কুঁচকে ভাবছি -
কি দারুন ব্যাপার ! একেই তো বিপ্লব বলা যায়।
হলেই বা তা, চিকিৎসাজগতে !
রুগী যাবে না ডাক্তারখানায় !
কি অসীম ভাবনায় –
একটা পাগল বলেছিল সেই কবে - ।
যুদ্ধের মাঠে এমনি করেই ফুটেছিল ;
থোকা থোকা সবুজ কুড়িঁ’রা -
কৃষ্ণচূড়া আর পলাশের লাল্চে উৎসবে।
২১শে মে,২০১৬
(দিবারাত্রির কাব্য – সাহিত্য সংখ্যা ২০১৮ এ প্রকাশিত)
মাঝে মাঝেই প্রেম পায় খুব।
লবটুলিয়া বইহারের যুগলপ্রসাদের যা—
রোজই পেত ! ফুল ফোটানোর তাগিদে—।
আমার তেমন করেই পায়।
তবে শুধু গাছে নয়, মনে—
প্রেম পেলে, শব্দগুলো অবিরল এসে যায়।
কবিতা তৈরী হয়ে ওঠে,
শব্দরা কুঁড়ি থেকে কেমন তরতরিয়ে ফুল হয়ে যায়,
কবিতায়।
বুঝতে পারি আমার অন্তর্গত রক্তের প্রবাহ-
কি অদ্ভুত ছুটোছুটি শুরু করে দেয়
শরীরের আনাচে কানাচে।
আর মনটা তখন বিকেলের কনে-দেখা-আলো’র মত
ছড়িয়ে যায় দিগন্তের দিকে।
প্রেম পায় খুব।
আর মনে হয় বারংবার, যে—
খানিকটা দারু পান করে নিয়ে বুঁদ হয়ে যাই।
অনায়াসে অক্লেশে।
পারি না সত্যিকারের প্রেমে মানুষ হয়ে উঠতে !
কলকাতা।
ধামাচাপা প্রকৌশলে, আরো কতো ফিকিরফন্দি কৌশলে মাপা।
বন্ধুরা ভালুক খোঁজে, যদি কিছু কথা পেটকাটি ভোকাট্টায়—
উড়ে উড়ে চলে যায় ! তারপরে ভাবা যাবে পদ্ম ফোটে কি না
রেল লাইনের ঝিলে, অসংখ্য বেওয়ারিশ কচুরিপানা
যেইখানে আনমনে, বেগুনী—বেগুনী ফুলে কম্পাস কাঁপায়।
উড়ে এসে খায় নাকো ভাগাড়ে’র পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট জঞ্জাল,
জঞ্জাল বানায় তারা,ক্লাব বা পার্টি’তে, ভাঙা আয়নায় কিম্বা
বোতলে বোতল ভেঙে। দল বাঁধা পেঙ্গুইন-সত্যিই আকাল।
অথবা নন্দন ঘুরে, নতুন গোলায় গিয়ে; রঙ হয় ফিকে।
কলকাতা
মা যে তোকে চাইছে বারংবার
সেই যে গেলি, ফিরছিস না কেন !
তুই না এলে বাড়ি-ই অন্ধকার।
তারা কেন ভেতর ভেতর চুপ ?
তুই কি তবে পাকা ধানের মই—
নাকি অপেক্ষাতে ?হাতে নিয়ে ধূপ ?
জানে কি তোর প্রাণে’র বন্ধু যারা ?
বন্ধু মানে দোসর,স্বজন,সাথী,
আড়ি-ভাবে’র,সময় পাবে তারা ?
শোনা কি যায় ?রাতের কড়া নাড়া—
বাড়ি এখন বন্দী ফ্ল্যাটের ঘরে,
হারিয়ে গেছে রাতের য’ত পাড়া।
বোতল-গেলাস্ গড়াগড়ি যায়—
নেশা যখন মাথায় চ’ড়ে বসে
বন্ধু’কে কি চিন্তে পারা যায় ?
মানিক সোনা আরো আদর চায়,
বকতে গেলে আইন আসে তেড়ে ;
এমনি করে আদর বেড়ে যায় !
নয় তো জানা কোথায় পাবো তোকে ?
বাঁশ বাগানের মাথার ওপর—
হারিয়ে গেলি ? কি বলি তোর মা’কে ?
ঘুরছে নাকি ? এ শহরের বুকে— ।
তোর তো তারা বন্ধু বলেই জানি,
পারছে তারা ? বসতে,খেতে শুতে ?
আমাদের কি নেইকো কোনো দায় !
আরো কত আদর দিয়েই,শেষে
‘বন্ধু’ মানেও পাল্টে দেওয়া যায় !
কলকাতা
দূর— আরো দূর থেকে,ধূসর আলো’র ঘ্রাণে,
পাখীদের ঘরে ফেরা—
বিকেল আর সন্ধ্যের সঙ্গমে আকাশের রঙ খেলা করে যায়,
জলপাই-এর পাতায় পাতায়,
যেন কোনো এক,অকারণ সহজতায় !
তাড়া নেই তার,তাড়া নেই সবকিছু চিন্তার -
অগুন্তি কুঞ্চিত কপাল-রেখায়।
বিকেলের প্রসাধন ফুরায় না তার।
রাশি রাশি পাটক্ষেত,এক হাঁটু জলে—
আনমনে বেড়ে ওঠে নিজের’ই খেয়ালে,
পাশাপাশি মাথা তুলে !
এক মাপে বেড়ে ওঠা দিগন্তের অসীম বিস্তারে—।
বাকি আধে—,অন্ধকার খেলা করে—
বেহুঁস চিন্তার রঙ যতক্ষণ গুহার ভেতরে !
কলকাতা
খঞ্জনা নেই আর— শ্যামা গান গায় নাকো !
জামফুল থোকা হয়ে ফুটে থাকে সবুজ আড়ালে—
একরাশ গন্ধ নিয়ে শুধু—।
একরাশ গন্ধ নিয়ে—
কতোদিন অপেক্ষা করে রয় জামফল,ছোট ঠোঁট ঠোকরাবে বলে।
টুনটুনি দোয়েলের ওড়াউড়ি কাঁপায় না আর
সবুজ পাতার ভীড়।
হিজলের ফুল ঝরে পড়ে— ঝরে পড়ে অবিরল—
শালিখের ডানা বেয়ে ঘাসে ভেজা বাঙলার সবুজ প্রান্তরে।
স্রোত নেই আর।
কচুরীপানার ফুলে ভ’রে থাকে নদী,
ডিঙিরা’ও ভেসে চলে গেছে সেই সদাগর সাথে।
কিশোরেরা শিখে গেছে লাল নীল সবুজের নানা কোলাহল।
শিখে গেছে মিথ্যের ফুলঝুরি কেমন বর্ণিল হয়ে ফোটে।
চাল ধোওয়া স্নিদ্ধ হাত ভুলে গেছে নিতে
ক্ষেতের চালের গন্ধ—
কোলাহল বেড়ে গেছে ঢের— ।
এসেছে কৌরব-কূল নতুন প্রশ্রয়ে,
আরো কিছু বিকলাঙ্গ জন্ম দেবে বলে।
কলকাতা
জলের ফোঁটা লেগে থাকা দোপাটি’র পাপড়ি’কে
আলতো করে দুহাতে ধরি।
তারপরে দুঠোঁট ভিজিয়ে পরম আশ্লেষে শুষে নিই
গর্ভকেশরের মাঝে জমে থাকা বৃষ্টির জল।
বৃতি’র আলগা স্পর্শে শিহরিত হয়ে উঠুক—
আমার নাকের দুই-পাশ।
দুগালে মাখাই,উদ্ধত পরাগরেণুর খসে পড়া রঙ।
শ্বাস নিই পরিপূর্ণ হৃদয়ে,যাতে মিশে আছে
পৃথিবীর সব গন্ধ –
যে গন্ধ জীবনের,যে গন্ধ সত্যি’র।
ফলের রসালো আস্বাদ আর
কামড়ানো বীজে’র ভীড়ে আবর্জনা-স্তূপ।
চুম্বন ভেসে যায় আর্সেনিক-জলে !
কলকাতা
উচ্চকিত ভাষা’র বর্ণমালায়—
এতো জঞ্জাল, যে—
রোজ লাগে কানখুস্কি।
দশদিকথেকেইসারাক্ষণ ধেয়ে আসে শব্দচাক।
তার সাথে ফাউ মেলে একদলা নিষ্ঠিবন,
কচিৎ কদাচিৎ।
শহর ভাসে প্রাণবন্যায় !
ঝর্ণার আছাড়ি-পিছাড়ি উল্লাসে যে মন মাতাল—
ঘরে ফেরা হাঁসের চই-চই এর মিষ্টি সুর
এমন কি দূরে ভেসে আসা রেল-গাড়ির ঝিক-ঝিক,
এসব তো কবে থেকে নেচে যায়—, হৃদকমলে।
অন্যদিকে কুফলী মানুষ।
শিক্ষা আনে চেতনা আর
চেতনা আনে বিপ্লব।
টাকা আনে ক্ষমতা আর
ক্ষমতা আনে মর্জি।
নিজেকে চেনাতে হয় তাই—
বিভিন্ন মাপের সাইনবোর্ডে।
আর প্রতিদিন
অসাড় হয়,মননের মধু।
গাছে আসে কচি পাতা।
মাটি পেলেই জন্মায় ঘাস !
কোন সে মন্ত্রে ?
আমার শহরে নামুক
একটু নীরবতা !
কলকাতা
পারবে কি কাছে আসতে ?
দূরের আকাশে বাজ যদি ভাঙে
পারবে কি ভাল-বাসতে ?
বর্ষা এখনো ভিজে হাওয়াটাকে
ভালবেসে ছেড়ে দেয় নি—
তাই যত মেঘ জলের আভাস,
খুঁজে ফেরে,তবু পায় নি।
আমি যদি চাই তোমার চোখেতে
আন্তেই পারি বৃষ্টি,
সে জলের টানভালবাসাময়—
চকিতে শ্রাবণ সৃষ্টি।
তোমার আমার মিলিত আবেগে
গাছে গাছে চাঁপা ফুটবে,
কদম তলায় উদাস বাঁশীটি
সুরে সুরে ফুটে উঠবে।
শুধু একবার, ছুটে এসো তুমি
আমার চোখেতে তাকিয়ে—
বর্ষা দেখবে—, ঠিক আসবেই
তোমার বুকেতে— ঝাঁপিয়ে।
জানি আমি জানি, ভালবাসা পারে
যতো সব কিছু মেলাতে—
তাই আমি শুধু ভালবাসাচাই,
অবোধ মন’কেচেনাতে।
চারপাশ আজ ভালবাসাহীন
শুধুই আগুন জ্বলছে—
এমন কথা কি কেউ ভেবেছিল
প্রেম কেঁদে ফিরে চলছে ?
এসো আরো কাছে, বর্ষা নামাতে ;
আমার বুকেতে ঝাঁপিয়ে—
আকাশে আসুক জল-ভরা মেঘ
তোমার দিকে’তে তাকিয়ে।
এত হানাহানি এত রাগ সব—
গলে যাক ভেজা জলে’তে
সাহারা মনে’র যতো কালো দ্বেষ,
ফিরে পাক প্রেমে— আলোতে।।
কলকাতা
নরকেও যদি নিয়ে যেতে চাও,
আপত্তি করবো না।
এ পৃথিবীর সব-কিছু পাথর—ও হজম হয়ে গেছে।
তাই আর ভাবিনা কিছুই।
কারণ তুমি তো জ্যান্ত, মিথ্যে তো নও !
সামনে আটা’র জিলিপি ঝুলছে—
মোটা সূতোয় !
তার চেয়ে মনে হয় নরকেই যাওয়া ভালো।
তবুও তো মুক্তি !
মিথ্যের চেয়ে যা লক্ষগুণ বাস্তব।
অনায়াসে পেতে চাই সেই গুহা-দরজায় প্রবেশের অধিকার।
মন্ত্র যেন মুখস্থ হয়ে গেছে—
পাল্টায়নি, পাল্টাচ্ছেনা, পাল্টাবেনা যেন আর !
যেন বাবুই পাখির বাসা।
নরকের রাস্তা’র দিকে এগিয়ে পড়ি।
তাতে অন্ততঃ মেকি আর মুখোশের থেকে বাঁচবো।
একটাই জীবন যখন—
কি লাভ আর ?
মিথ্যের তুলি’তে কবিতার ক্যানভাস এঁকে চলা ?
আমি তো কোন ছার !
এক গন্ডা বর্ণ, লন্ডভন্ড করে দিতে পারে সব-।
সে শব্দের টানে সবুজ মাথা তোলে পাতা
জলে আসে জোয়ারের কল্লোল।
আর,
নামে শ্রাবণ যে কোনো সময়েই।
শিরদাঁড়া বেয়ে কেন উঠে আসে প্রাণস্পর্শী রক্ত-হিল্লোল।
কেনই বা সন্ধি’তে সন্ধি’তে ধামসা-মাদল ?
রাতজাগা দুপুরে কেন শোনা যায় বাজপাখীর সুতীব্র চিৎকার !
একেই কি বলে আয়োজন –
নতুন রাগে’র ?
এ-হাত ও-হাত ঘুরেই যেতো স্বপ্নমাখা চোখে।
হয়তো আবার কাঁধের দুপাশ আমার দুটো-পা
হাত-দুখানায় চুলের মুঠি, আকাশ দূরে যা-।
ভোর না হতেই মায়ের তাড়া, তুমি তখন চুপ,
এদিক ওদিক শুকনো মুখে নির্বাক নিশ্চুপ।
কিছুটা পথ যেতে যেতেই ঘন্টা শোনা গেলে
চলার ছন্দ দ্রুত আরো, কাঁধের ওপর ছেলে।
স্কুল গেটটা এগিয়ে আসে বুকের ভেতর জ্বালা
আবার কখন পাবো ছুটি ঘরে ফেরার পালা।
আসার পথে কত রকম লোকের সাথে দেখা
তোমার চোখে সর্ষেফুলের হলুদ গন্ধ মাখা।
আমি তখন রাজপুত্তুর হাতে স্কুলের ব্যাগ –
রামধনু রঙ চারিদিকেই মনেতে জেট-ল্যাগ।
আবার পাওয়া পরের দিনের সূর্য ওঠা ভোরে,
বাকি সময় অন্য লোকে নেয় যে আমায় কেড়ে।
আবার রাতে পাশে শোওয়া এক পা বুকে তুলে-
ঘুম এসে যায় দু-চোখেতেই ঘুমিয়ে পড়ি ভুলে।
আমার ছেলে ফিরিয়ে দিল সেসব স্মৃতি’র মালা।
যেদিন ছেলে পা তুললো আমার বুকের মাঝে -
তখন শুনি পাগলা সানাই দূরে কোথাও বাজে।
সামনের রাস্তার ওপারের উঁচু বাড়িটা -
চোখ আর কাঞ্চনজঙ্ঘা'র মাঝে
চীনের প্রাচীর যেন।
বর্ষার ছন্নছাড়া মেঘগুলো,
জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে ঘরে।
পালাবার পথ নেই আর, আর তাই-
জামাকাপড়, গামছা-মোজা, চাদর-বালিশেই
মাখামাখি করে মিশে যাওয়া।
মেঘের গন্ধ মাখা বালিশে কারা যেন খেলা করে!
শুধুই খেলা করে
আমাদের অর্জিত আধুনিক চিন্তার মতো।
অথবা -
সেই জালিয়ানওয়ালাবাগের একটাই পথের মতো।
বেরোনোর পথ নেই আর।
চিন্তার স্বপ্নগুলো তেমনি করেই কি -
মিশে যাচ্ছে আমাদের চাদর-বালিশের সাথে ?
অন্য জানলাটা না থাকায় -।
১২ই জুন, ২০১৬
গাড়িতেই হুল্লোড়, পেটে নেশা কিঞ্চিৎ -
ফাঁকা ফাঁকা পথঘাট, গাছপালা দুলছেই ;
নিয়নের ছায়াতেই দেখে চোখ্ চিত্তির।
উইন্ডস্ক্রীনেতে লোভ তলপেটে কষ্ট !
জিভে জল চুক্চুক্ নিঃশ্বাস বন্ধ,
আরো কাছে আসতেই উউফ্ কি আনন্দ!
জিন্সের ট্রাউজারে গুটি গুটি পা’য় পা’য় -
রঙ বোঝা মুশকিল্ ঝিকুমিকু আঁধারে,
মনে হয় খুবই কচি মন নাচে বাহারে !
খপ করে টেনে নিয়ে চলল ড্যাডাং ড্যাং ;
ফাঁকা পীচ রাস্তায় নতুন দিনের শুরু,
পেছনেতে প্রজাপতি ছিঁড়ে খায় গ্যাংগুরু।
লোভে প্যান্ট চটচটে পেছনেতে শুধু চায়,
পূজো শেষ করে গুরু সামনেতে টপকায়
পালা করে মাকড়সা প্রজাপতি চটকায়।
ছোটখাটো বিস্ময় চোখে আর পড়ে না যে।
লরী ধরে নজরানা ভাগাভাগি বখেড়ায়,
মাঝ রাত লজ্জায় কত পাপ দেখে যায়।
পাখা তার ভাঙাচোরা নড়াচড়া করা দায়।
ভোর হয় শহরেতে চলাচল ভীড় বাড়ে -
প্রজাপতি মুখ গুঁজে থুবড়েই এক ধারে।
প্রজাপতি পাখনায় আজ শুধু সাদা ছাপ।
কলকাতা বেঁচে নাকি বাড়ি ঘর উঁচু তার -
মাকড়সা জাল বোনে চারদিক ছারখার।
রাজা আসে রাজা যায় পত্তন নতুনের।
ঢাল ছাড়া নিধিরাম চোখ পড়ে শকুনের।
শকুন মাংস খোঁজে প্রজাপতি রঙ চায় -
শহরটা ঢেকে গেছে শীতঘুমে কুয়াশায়।।
বাঙলা শব্দগুলো তখন রামধনু –
শব্দের মালা কিছুতেই মনে গাঁথা যায় না।
কচ্কচানি আর বিজ্ঞাপনের মিলমিশে
এক অপূর্ব যন্ত্রের চাকর হয়ে যাচ্ছি,
দিন কে দিন।
যে দিন যা তরকারী জোটে গিন্নির পরিবেশনে,
চুপচাপ খেয়ে নি।
নেতাদের ঝগড়া, বুদ্ধিজীবীদের হিতোপদেশ, মন্ত্রীমশাইদের বাহানা -
আরো কতো কিছু।
তরকারীটা যেদিন সত্যি সত্যিই ভাল হয় –
তখন মনে হয় সত্যি তো ! সব তো সত্যি কথা !
আর যেদিন শুধু ঢ্যাঁড়শের ফাইবার দাঁতে আটকায় –
সেদিন মনে হয় যেন কিছু শব্দের অর্থ পাল্টে গেছে।
সাম্প্রদায়িক বা ধর্ম-নিরপেক্ষ ইত্যাদি ইত্যাদি।
আর যেদিন -
কখনো মসৃন, তো কখনো দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে চেবানোর প্রক্রিয়া।
খেতে খেতে তো আর টুথপীক দেওয়া যায় না !
কিন্তু যাই হোক না কেন – গিল্তেই হয় সব।
তারপরে মুখ ধোয়া আর টিভি বন্ধের ঘোষনা –
মশারী ফেলার তোড়জোড় !
চৈতন্য মহাপ্রভুর কথা ভাসে মনে।
তিনি তো সাম্প্রদায়িক-ই ছিলেন তার মতে।
ধর্ম-নিরপেক্ষ ছিলেন কি ?
বুঝতে পারি না মোটা মাথায়।
কাল একবার জিজ্ঞেস করতে হবে –
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলি।
কিন্তু, কাকে জিজ্ঞেস করি ?
ভাবতে থাকি আমাদের ভাগ গুলো।
কেউ অ-সাম্প্রদায়িক আর ধর্ম-নিরপেক্ষ।
কেউ সাম্প্রদায়িক আর ধর্ম-নিরপেক্ষ।
কেউ অ-সাম্প্রদায়িক আর ধর্ম-সাপেক্ষ।
কেউ সাম্প্রদায়িক আর ধর্ম-সাপেক্ষ।
এছাড়া কি আর কিছু বাকি পড়লো ?
ধর্ম আর সম্প্রদায় ছাড়া আর কি কেউ পড়ে রইল নাকি ?
ঘুম আসছে চোখে –
দেখি, স্বপ্নের অতিথিরা কি বলে আজ !
নীচেতে যখন চরম দুর্বিপাক।
চুপি চুপি তাই আলাদা আলাদা কথা।
আধো ঘুমে তাই কল্পিত ডায়াগ্রাম।
যে তেল শুধুই জ্বলা ছাড়া বাকি স’বে।
ইতিহাস পায় রূপকথা নামাবলী।
আমরা তো তবু মনু’র রক্তে ঋণী।
মনের প্রহরে গুণ-ভাগ-যোগ খেলা।
বুড়ো আঙুলেই বিচারের বাণী কাঁদে।
কলি’র বিকেলে কেতনের রঙে ভাগ।
জ্বলজ্বল চোখে আধপেটা খেয়ে বাঁচা।
সূতপুত্রও দলে যোগ দিলে উল্লাসধ্বনি ওঠে।
রাজনীতি তাই কুটিল চতুর অঙ্ক মেলানো যোগ।
অহং বোধের বন্যা তখন নিশ্চিত শুয়ে রবে।
(এপার ওপার ইছামতী -আত্মপ্রকাশ সংখ্যা – ১৪২৩ এবং খোয়াবনামা পত্রিকায় প্রকাশিত)
জানলার কাঁচ দিয়ে দেখছিলাম রোদের আঁচ।
দুপুর এখন –
আর একটু পরেই বিকেল আসবে বাইরের বারান্দায়।
ঘরের ভেতর যদিও কুড়িতে চলছে তাপমাত্রা’র পারা
তাও মিষ্টি লিচুগুলো’র খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে –
ডান হাতের বুড়ো আঙুলে’র নখে বেশ ব্যথাই লাগে।
তার সাথে,
ট্যাবটা আজকাল খুব ধীরে চলছে কেন বোঝা দায় !
ফেসবুকের পাতা থেকে পাতায় যেতে দীর্ঘ সময়।
মন খুব অস্থির, নানান পরীক্ষার ফলাফলে।
কত কি করার ছিল, কত কি বলার ছিল যেন -।
কাকেই বা বলি যে এই প্রবীন বয়সেও উত্তাপ এনে দেয় –
কিছু কবিতা, কিছু ছবি আর কিছু চটুল রচনা।
হাতের মুঠোয় সারা বিশ্ব আজ –
কালী’দাস থেকে সানি লিওন যাকেই যখন চাই ভালোবেসে,
সবাই হাজির হয়ে পড়ে আট ইঞ্চির এই ট্যাবটায়।
হলুদ কাগজে মোড়া
কলেজ জীবনের ফুটপাথে রাখা সেই কোকশাস্ত্রের বইগুলো,
আর চোখে পড়ে না এই শহর কলকাতায়।
এখন গুগুলে, চটি লিখলেই তামাম শাস্ত্র হাজির এক নিমেষে।
যদিও লজ্জা করে এখন সেগুলো পড়তে তবুও -
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সেগুলো খুলে,ঠিক করে দিই বাংলা বানানগুলো।
কিন্তু পারি না।
অনেক কিছুই পারি না আর।
হাত তুলে চেঁচামেচি করতে গেলেই বুক ধক্ধক্ করে।
তার চেয়ে এই আছি বেশ।
জ্ঞানে অজ্ঞানে যাপিত জীবন।
চালাক আর চালাকির মেকি মুখোশ – বেশ লাগে।
ভাল লাগে এই ফেসবুক এর কথার মারপ্যাঁচ্ -
ভাল লাগে খবরের চ্যানেলে চ্যানেলে সারা সন্ধ্যে কাটাতে –
কত কি জানতে পারি আজকাল।
দরকারে ঘরের তাপমান কমা-বাড়া করি রিমোট যন্তরে।
আজ শুনি আর কাল সকালেই হাটাঁর পরে চায়ের দোকানে,
যোগ দিই আলোচনায়।
এখন সীমা আমার এইটুকুই।
ফ্ল্যাটের দরজা থেকে খুব জোর বড়রাস্তার মোড়।
তারপরে বাড়ি ফিরে গিন্নি’র হাতে অসহায় আত্মসমর্পন।
বলেছিলেন – ‘আপনি আমায় মেশিনগানের মতো করে ব্যবহার করুন।’
আরো বলেছিলেন, সেই পাগলা ডাক্তারে –
‘রুগী আসবে না ডাক্তারখানায়। ডাক্তারকে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে -,
দেখে নিতে হবে রুগী আছে কোন বাড়িতে।’
কেমন যেন লাগেনা কথাগুলো ?
এই গরমের দুপুর–বিকেলের মাঝে,ঠান্ডা ঘরে বসে এগুলো পড়তে পড়তে,
পৌঁছে যাই সেই যুদ্ধক্ষেত্রে।
যেখানে পরের পর ডাঃ বেথুন খোলা জায়গায় বানানো তাঁবুতে,করে চলেছেন
পঞ্চাশ, ষাট কিংবা আশিখানা অপারেশন, এক দিনে !
আর চোখমুখ কুঁচকে ভাবছি -
কি দারুন ব্যাপার ! একেই তো বিপ্লব বলা যায়।
হলেই বা তা, চিকিৎসাজগতে !
রুগী যাবে না ডাক্তারখানায় !
কি অসীম ভাবনায় –
একটা পাগল বলেছিল সেই কবে - ।
যুদ্ধের মাঠে এমনি করেই ফুটেছিল ;
থোকা থোকা সবুজ কুড়িঁ’রা -
কৃষ্ণচূড়া আর পলাশের লাল্চে উৎসবে।
(দিবারাত্রির কাব্য – সাহিত্য সংখ্যা ২০১৮ এ প্রকাশিত)
#
তুমি কবি -
তোমারি চেতনার রঙে প্রাণ হয় সবুজ –
মন ওঠে আলো হয়ে।
তবু কেন ?
তোমার চোখ দিয়ে এখনো কেন
দেখতে পেলাম না -
ভ্রাতৃত্ব, মাতৃত্ব, পিতৃত্ব, বন্ধুত্ব কিংবা –
পূব আর পশ্চিমের,
সেই খোলা হাওয়া !
হিংসা, ঘৃণা, কপটাচার আর অসূয়া -,
এখনো তো চরম বাস্তব।
আরো যেন ঘনীভূত নিম্নচাপ,
আমাদের মনের আকাশে !
জলহীন, বৃক্ষহীন, আলোবাতাসহীন
এ এক দুস্তর সময়।
ক্রোধ, লালসা, রক্তোল্লাসের প্রাত্যহিক প্রবাহ।
কি দিয়ে গেলে কবি আমাদের ?
গ্রীষ্মের নিদাঘ দুপুরে শুধু তোমার গানের
খাঁ খাঁ করা পীচ রাস্তা ?
অনেক ব্যঙ্গ শুনেছ, তুমি, কবি –
কখনো তুমি জমিদার,
কখনো ধনীগৃহের শৌখিন বাঁশিওয়ালা !
আবার কখনো তুমি বিশ্বব্যাপী উন্মাদ প্রেমিক।
উদাত্ত অনুদাত্ত স্বরে কখনো শুনেছি –
তুমি ছিলে এক শোষক প্রতিভূ।
উত্তরে নিরুত্তর তুমি, ছিলে স্থবির, জঙ্গম।
কি করে পেয়েছিলে তুমি -
এতো অপরিমান সহিষ্ণুতা ?
তুমি জেনে রাখো কবি –
এখন নাকি, অধিক বিক্রীত,
তোমার কানভাঙানি বই।
আর ঔৎসুক্য
জোড়াসাঁকো’য় বৌঠানের সেই বন্ধ ঘরখানি।
তবু তুমি
আমাদের অন্তরে
জ্বালাও আলো দিনরাত –
এক অপূর্ব সবুজ প্রান্তরে
কোথায় যে হারিয়ে যাও তুমি ? -
মাঝে মাঝেই।
মন কেমন করা একটানা সুর –
বেজে চলে,
বেজেই চলে শুধু।
আমার মুক্তি তোমার আলোয় আজ আকাশে
আমার মুক্তি দিকে দিকে তোমার শ্বাসে।
পূর্ণ করো সেই দুরাশা
সবার মনেই জ্বালাও আশা –
বারে বারে।
এই শতকের আধাঁর ঘোচাও
তিমির নাশে -
পায়ে দলা,
শুকনো ঘাসে।।
২৫শে বৈশাখ, ১৪২২
৯ই মে, ২০১৬
#
প্রচেতা –
আর কি করে ডাকবে তোমায়
হে জলাধিপ, পাশপাণি ?
সংবাদে প্রকাশ -
সুদূর উত্তরে তুমি আশার আলো নও।
সেখানে -
প্রতি সন্ধ্যায় তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি
প্রাণ, মন, দেহে, বোলায় তোমার বারিস্পর্শ।
জানি, জানি
এখানে উত্তপ্ত মাটি চাতক হয়ে আছে
পরীক্ষা’র ফলাফলের
লোহিত ঘ্রাণের -
নোন্তা স্বাদের বাগ্মিত অপেক্ষায় !
সে তুমি জানো।
তবে কি ভয়ার্ত তুমি ?
শুনেছি আদিকালে যজ্ঞের সেই অনল শিখা’র
চুম্বক অভিকর্ষে -
ধরিত্রী শ্বাস নিত তোমার ধারায়।
তবে কেন আজ -
এতো এলোমেলো সব।
জ্ঞান কি ক্ষয়িত আজ, -
বিজ্ঞানের সক্রিয় বহমানতায় ?
তবু তুমি ফিরে এসো –
ফিরে এসো আমাদের অব্যক্ত যন্ত্রণাবিদ্ধ শরীরে।
এতোটুকু শান্তিবারি দাও আমাদের –
ফেরাও সেই লুম্বিনি বন, কপিলাবস্তু।
৩রা মে, ২০১৬
#
ত্রিমূর্তি -
সম্মুখে ডানে বামে -
তিন মূর্তি’র ক্ষয়িত রূপে
স্থাপিত হয়ে আছো এলিফ্যান্টায়।
চোখে অজন্তার ফ্রেস্কো’র টানা রূপ -
আরব সাগরের লোনা হাওয়ায় বিবর্ণ।
মৃদুমন্দ হাওয়ায় উতরোল, গুহার অন্দর।
দর্শনে উদ্বেল অগণিত মানুষের পরিশ্রম
বন্দী হচ্ছে শাটারের ক্লিক ক্লিক শব্দে।
তুমি ধ্যানমগ্ন,
সামনের দিকে প্রসারিত তোমার দৃষ্টি
গুহার পাঁচিলে ধাক্কা খায় বারংবার।
আর আমি দেখতে দেখতে কল্পনায় ভাসি –
ত্রিমূর্তি’র পেছনে এক অদৃশ্য শিল্পী’র ছেনী হাতুড়ি’র শব্দে
তৈরী হচ্ছে আর এক মুখ।
আগামী পৃথিবীতে যাতে –
সব কিছু তোমার চোখে পড়ে,
আমাদের সোনালী চর্তুভুজে।
১লা মে, ২০১৬
#
শব্দেরা আজ -
আর কতো কালকূট পান করবো হে দেবেশ ?
তোমার কন্ঠনালী বুঁজে আছে আজন্ম হলাহলে –
তাই কি, সুধা কেড়ে নিয়ে
আমাদেরও করেছো অঙ্গীকার
প্রাত্যাহিক বিষপানে ?
যেদিকেই দৃষ্টি ফেরে সেদিকেই
শব্দের আবর্জনাগুলো
উপছে পড়ে তরল গরলে।
চারদিকে শুধু হলাহল ভরা শব্দের অবিরত অত্যাচার।
বিপন্ন বর্ণমালা আজ বন্দী শুধু –
কয়েকটি আধুনিক শব্দের দুর্যোধনি শক্তি’তে।
বিশেষ্য-বিশেষণ-সর্বনাম-ক্রিয়া আর অব্যয়ের
মেলামেশা আজ
দুই বা চার বর্ণের অযুত নিযুত ব্যবহৃত শব্দমালায়
আজ শুকনো বাসি ফুলের অপর্যাপ্ত হাহাকার।
কান পেতে রেখে কি অবিশ্রাম উচ্চকিত রণন -
অবহেলা ভরে শুষে নাও হে দেবেশ, প্রতিক্ষন প্রতিদিন !
আমরা যে অসহায় জনার্দন।
স্বননে গর্জনে হরিধ্বনি আজ যেন পঞ্চমের ঝংকৃত সুরের –
শ্লোগানী সঙ্গীত !
হে দেবেশ, শান্ত করো।
শান্ত করো ঝিকিঝিকি মায়াবী দোলায়।
হে দেবেশ !
মেহবুবা মেহবুবা গতি পাক জিন্দেগীর এক সফরে।
২৮শে এপ্রিল, ২০১৬
#
কিছু কথা –
মনের গভীরে রঙীন মাছের খেলা
নগ্ন জলেতে ভেসে ওঠা বুদ্বুদ
অতল তলেতে শ্যাওলা সবুজ লেপ
শুক্তি গর্ভে জমে টলটলে দুধ।
কত লুকোচুরি অন্তরে বাঁধে বাসা
বহতা জীবন নদীর মাথায় ঢেউ
গভীরে ফল্গু, ঢিমিঢিমি স্রোতে বয়
সেই নদীপথে প্রবেশ কি করে, কেউ ?
একলা পথের অজানিত সেই খেলা
দোসরজীবন ছায়া পায় শুধু তার,
রোদ্দুর-জলে আরো সুরভিত মধু
ব্যাক্তি মননে নিস্পাপ বিস্তার।
আনন্দ তাই ভরে ওঠে অকারণে
ভাগফলে যতো শূণ্যের হাহাকার –
সন্ধ্যের আগে যুঁইকুঁড়ি মেলে পাখা
কে রাখে খবর, ফুটে ওঠা রোজকার।
সব ভাষা যদি সহজিয়া উত্তাপে
প্রকাশিত হয় বিশ্বভুবন মাঝে।
অনুষঙ্গের নীরব বহতা ধারা
ফুলে পল্লবে নীরবে নিভৃতে সাজে।
মনের যে কথা বলা যায় শুধু যাকে –
চলিত জীবনে হয় কি, সেকথা বলা ?
সেই কথা জানি, দ্রিমি দ্রিমি সুরে বেজে
নিজের হৃদয়ে ঘুরে ঘুরে পথ চলা।
সংবৃত কিছু হৃদয়েতে নিশ্চিত
কুয়াশা চাদরে আড়াল খুঁজেই সুখী,
সে সুখের ছোঁয়া অভিমানী রূপকথা
স্বর্ণজালিতে গোপনেই মুখোমুখি॥
১৬ই এপ্রিল, ২০১৬
(রেওয়া - বইমেলা সংখ্যা - চতুথ বর্ষ - অষ্টম সংখ্যা - জানুয়ারি ২০১৮য় প্রকাশিত। এবং শনিবারের আসর গ্রুপের প্রতিযোগীতায় প্রথম)
মন ওঠে আলো হয়ে।
তবু কেন ?
তোমার চোখ দিয়ে এখনো কেন
দেখতে পেলাম না -
ভ্রাতৃত্ব, মাতৃত্ব, পিতৃত্ব, বন্ধুত্ব কিংবা –
পূব আর পশ্চিমের,
সেই খোলা হাওয়া !
হিংসা, ঘৃণা, কপটাচার আর অসূয়া -,
এখনো তো চরম বাস্তব।
আরো যেন ঘনীভূত নিম্নচাপ,
আমাদের মনের আকাশে !
জলহীন, বৃক্ষহীন, আলোবাতাসহীন
এ এক দুস্তর সময়।
ক্রোধ, লালসা, রক্তোল্লাসের প্রাত্যহিক প্রবাহ।
গ্রীষ্মের নিদাঘ দুপুরে শুধু তোমার গানের
খাঁ খাঁ করা পীচ রাস্তা ?
কখনো তুমি জমিদার,
কখনো ধনীগৃহের শৌখিন বাঁশিওয়ালা !
আবার কখনো তুমি বিশ্বব্যাপী উন্মাদ প্রেমিক।
উদাত্ত অনুদাত্ত স্বরে কখনো শুনেছি –
তুমি ছিলে এক শোষক প্রতিভূ।
উত্তরে নিরুত্তর তুমি, ছিলে স্থবির, জঙ্গম।
কি করে পেয়েছিলে তুমি -
এতো অপরিমান সহিষ্ণুতা ?
তুমি জেনে রাখো কবি –
এখন নাকি, অধিক বিক্রীত,
তোমার কানভাঙানি বই।
আর ঔৎসুক্য
জোড়াসাঁকো’য় বৌঠানের সেই বন্ধ ঘরখানি।
আমাদের অন্তরে
জ্বালাও আলো দিনরাত –
এক অপূর্ব সবুজ প্রান্তরে
কোথায় যে হারিয়ে যাও তুমি ? -
মাঝে মাঝেই।
মন কেমন করা একটানা সুর –
বেজে চলে,
বেজেই চলে শুধু।
আমার মুক্তি দিকে দিকে তোমার শ্বাসে।
পূর্ণ করো সেই দুরাশা
সবার মনেই জ্বালাও আশা –
বারে বারে।
এই শতকের আধাঁর ঘোচাও
তিমির নাশে -
পায়ে দলা,
শুকনো ঘাসে।।
৯ই মে, ২০১৬
হে জলাধিপ, পাশপাণি ?
সংবাদে প্রকাশ -
সুদূর উত্তরে তুমি আশার আলো নও।
সেখানে -
প্রতি সন্ধ্যায় তোমার উজ্জ্বল উপস্থিতি
প্রাণ, মন, দেহে, বোলায় তোমার বারিস্পর্শ।
জানি, জানি
এখানে উত্তপ্ত মাটি চাতক হয়ে আছে
পরীক্ষা’র ফলাফলের
লোহিত ঘ্রাণের -
নোন্তা স্বাদের বাগ্মিত অপেক্ষায় !
সে তুমি জানো।
তবে কি ভয়ার্ত তুমি ?
চুম্বক অভিকর্ষে -
ধরিত্রী শ্বাস নিত তোমার ধারায়।
তবে কেন আজ -
এতো এলোমেলো সব।
জ্ঞান কি ক্ষয়িত আজ, -
বিজ্ঞানের সক্রিয় বহমানতায় ?
ফিরে এসো আমাদের অব্যক্ত যন্ত্রণাবিদ্ধ শরীরে।
এতোটুকু শান্তিবারি দাও আমাদের –
ফেরাও সেই লুম্বিনি বন, কপিলাবস্তু।
তিন মূর্তি’র ক্ষয়িত রূপে
স্থাপিত হয়ে আছো এলিফ্যান্টায়।
চোখে অজন্তার ফ্রেস্কো’র টানা রূপ -
আরব সাগরের লোনা হাওয়ায় বিবর্ণ।
মৃদুমন্দ হাওয়ায় উতরোল, গুহার অন্দর।
দর্শনে উদ্বেল অগণিত মানুষের পরিশ্রম
বন্দী হচ্ছে শাটারের ক্লিক ক্লিক শব্দে।
তুমি ধ্যানমগ্ন,
সামনের দিকে প্রসারিত তোমার দৃষ্টি
গুহার পাঁচিলে ধাক্কা খায় বারংবার।
ত্রিমূর্তি’র পেছনে এক অদৃশ্য শিল্পী’র ছেনী হাতুড়ি’র শব্দে
তৈরী হচ্ছে আর এক মুখ।
আগামী পৃথিবীতে যাতে –
সব কিছু তোমার চোখে পড়ে,
আমাদের সোনালী চর্তুভুজে।
তোমার কন্ঠনালী বুঁজে আছে আজন্ম হলাহলে –
তাই কি, সুধা কেড়ে নিয়ে
আমাদেরও করেছো অঙ্গীকার
প্রাত্যাহিক বিষপানে ?
যেদিকেই দৃষ্টি ফেরে সেদিকেই
শব্দের আবর্জনাগুলো
উপছে পড়ে তরল গরলে।
চারদিকে শুধু হলাহল ভরা শব্দের অবিরত অত্যাচার।
বিপন্ন বর্ণমালা আজ বন্দী শুধু –
কয়েকটি আধুনিক শব্দের দুর্যোধনি শক্তি’তে।
বিশেষ্য-বিশেষণ-সর্বনাম-ক্রিয়া আর অব্যয়ের
মেলামেশা আজ
দুই বা চার বর্ণের অযুত নিযুত ব্যবহৃত শব্দমালায়
আজ শুকনো বাসি ফুলের অপর্যাপ্ত হাহাকার।
কান পেতে রেখে কি অবিশ্রাম উচ্চকিত রণন -
অবহেলা ভরে শুষে নাও হে দেবেশ, প্রতিক্ষন প্রতিদিন !
স্বননে গর্জনে হরিধ্বনি আজ যেন পঞ্চমের ঝংকৃত সুরের –
শ্লোগানী সঙ্গীত !
হে দেবেশ, শান্ত করো।
শান্ত করো ঝিকিঝিকি মায়াবী দোলায়।
হে দেবেশ !
মেহবুবা মেহবুবা গতি পাক জিন্দেগীর এক সফরে।
নগ্ন জলেতে ভেসে ওঠা বুদ্বুদ
অতল তলেতে শ্যাওলা সবুজ লেপ
শুক্তি গর্ভে জমে টলটলে দুধ।
কত লুকোচুরি অন্তরে বাঁধে বাসা
বহতা জীবন নদীর মাথায় ঢেউ
গভীরে ফল্গু, ঢিমিঢিমি স্রোতে বয়
সেই নদীপথে প্রবেশ কি করে, কেউ ?
দোসরজীবন ছায়া পায় শুধু তার,
রোদ্দুর-জলে আরো সুরভিত মধু
ব্যাক্তি মননে নিস্পাপ বিস্তার।
ভাগফলে যতো শূণ্যের হাহাকার –
সন্ধ্যের আগে যুঁইকুঁড়ি মেলে পাখা
কে রাখে খবর, ফুটে ওঠা রোজকার।
প্রকাশিত হয় বিশ্বভুবন মাঝে।
অনুষঙ্গের নীরব বহতা ধারা
ফুলে পল্লবে নীরবে নিভৃতে সাজে।
চলিত জীবনে হয় কি, সেকথা বলা ?
সেই কথা জানি, দ্রিমি দ্রিমি সুরে বেজে
নিজের হৃদয়ে ঘুরে ঘুরে পথ চলা।
কুয়াশা চাদরে আড়াল খুঁজেই সুখী,
সে সুখের ছোঁয়া অভিমানী রূপকথা
স্বর্ণজালিতে গোপনেই মুখোমুখি॥
(রেওয়া - বইমেলা সংখ্যা - চতুথ বর্ষ - অষ্টম সংখ্যা - জানুয়ারি ২০১৮য় প্রকাশিত। এবং শনিবারের আসর গ্রুপের প্রতিযোগীতায় প্রথম)
#
ঋতু -
জানলায় ঝুঁকে থাকা স্বর্ণচাঁপা গাছটা
সবুজ পাতার আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে
শ’য়ে শ’য়ে পল্লবিত সোনালী ফুলগুলো।
একটা ঘোরলাগা মৃদু গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে
জানলার ভেতরে, বাইরে।
সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব ছন্দে ফুলদল দুলছে
বসন্তের মৃদুমন্দ হাওয়ায়।
আমার খুব প্রিয় এই স্বর্ণচাঁপা –
বেশ কয়েক বছর আগে একটা ছোট্ট চারা এনে
রোপন করেছিলাম আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির পশ্চিম কোনায় –
ঘন চাঁপার পাতার মধ্যে দিয়ে একদিন সূর্যাস্ত দেখব বলে।
সেই চাঁপাগাছ এখন আমার দোতলা বারান্দা ছাড়িয়ে
অনেক, অনেক ওপরে,তর তর করে বেড়েই যাচ্ছে।
ভয় করে আমার –
আর কয়েক বছর পরে আমার জানলা থেকে ফুল দেখতে পাবো তো ?
নিয়ম মেনেই বাড়,
ঋতু মেনেই ফুল -
আর তারপর ফুলে ফুলে গর্ভসঞ্চার।
ফল হয়ে ওঠবার দুরন্ত আকর্ষণে।
একাউন্টেন্সীর ডাবল এন্ট্রি সিস্টেমের মতো
ট্রায়াল ব্যালেন্স মিলবেই প্রকৃতিতে।
ছাড় নেই কোনোই।
ঠিক নিয়মেই রানীর ঋতু বদলায়।
কখনো গনগনে আঁচে
কখনো আবার নতুন সৃষ্টির ধারাজলে।
ফাঁকা ধানক্ষেতে হেমন্ত এসে চলে যায় –
বসন্তের সূচনারম্ভে।
বিস্তার, বিস্তার এবং বিস্তার।
ধূপছায়া রঙের শাড়ি।
পেরিয়ে গেল চাঁপাতলা।
বিকেলের গরম রোদ চকচকে উজ্জ্বল –
তেরছা করে পড়ে চাঁপাপাতায়।
কিছু ফুল ঝরে পড়ে নীচের চাতালে।
ঋতুচক্রের আবর্তনে গাছ বোঝে,
কখন সময় হবে ফুল ফোটানোর।
সৃষ্টির ক্রিয়া অন্তঃসলিলা সরস্বতী।
ঠিক বহে যায় সকল সময়।
কোথাও তো নেই কোনো মানা তার।
তবে কি আমরা প্রকৃতিসৃষ্ট নয় ?
কেন তবে এতো সামাজিক গন্ডী’র স্থুল অমাবস্যার অন্ধকার ?।
কেন তবে ঋতুর নির্ঝরে বেগবতী রমনী’র –
গরলের দিনে সরে থাকা’র আজন্মলালিত অনুশীলন।
কেন তবে বাণে’র চতুর্থী শেষে –
শূচিতা’য় ফেরা ?।
পুরুষেরো তো রীতিমত ঋতু’র
চাঁদমালা,
ঝলকে ঝলকে দেহে আবির্ভাব।
তার না আছে সময়, না আছে নির্দিষ্ট রীতিনীতি।
উদ্ভাসিত উত্তেজনার চরম মুহূর্তে কল্পিত অশালীন প্রত্যয়।
স্থির বিশ্বাসী শূচিতা’র আন্তরিক গলগ্রহ !
আর সব চলাচলে পৌনঃপুনিক যাদু।
বয়ে চলে সময়ের চাকা –
প্রজাপতি উড়ে যায় পরাগমিলনে।।
১৩ই এপ্রিল, ২০১৬
#
সংযম
পরিমিতি শুধু জ্যামিতিক পরিমাপে
উঁচু ডেসিবলে শব্দ পড়েছে বাঁধা,
মিতাচার আজ অনীহা’য় বেপরোয়া
কত ভাবে তাই উদ্দাম গলা সাধা।
নিরপেক্ষতা অভিধানে ধূলো ঝাড়ে
বিদ্বেষ যেন ছায়াতেও গরিয়ান,
উটপাখী তবু মাথা তুলে ভেবেছিল
ছায়া ক্ষয়ে যায়, হারাবেই সম্মান।
জীবন যাপন মতদান ছাড়া বৃথা
শুনি এই বাণী আমাদের পোড়া দেশে –।
আবেগ এখন ইস্তেহারে’তে ভেজা
তাই যেতে চায় অজানা নিরুদ্দেশে।
শেষের কবিতা শোনাবেই - রাজনীতি
শ্রেণী ভাগ করে খোঁজা হবে ফুলফোটা,
প্রেম বদলাবে প্রাচীন সংজ্ঞা ভুলে -
ধ্বনিভোটে পাবে নতুন শব্দ “নোটা”।
বকুল, পারুল, আম বা জারুল বনে
ক্লোন উপাচারে ফুটবে নতুন ফুল।
শ্লোগানের সুরে ডাকবেই সব পাখী
নদীর জলেতে উপছোবে নাকো কূল।
এমন করেই ছুঁয়ে থাকা রাজনীতি
আষ্টেপৃষ্টে ছড়াবে কি তার জাল ?
ব্যক্তিস্বার্থ কোথায় লুকোবে তবে
কোথায় হারাবে মননের দ্রোহকাল ?।
২রা এপ্রিল, ২০১৬
সবুজ পাতার আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে
শ’য়ে শ’য়ে পল্লবিত সোনালী ফুলগুলো।
একটা ঘোরলাগা মৃদু গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে
জানলার ভেতরে, বাইরে।
সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব ছন্দে ফুলদল দুলছে
বসন্তের মৃদুমন্দ হাওয়ায়।
আমার খুব প্রিয় এই স্বর্ণচাঁপা –
বেশ কয়েক বছর আগে একটা ছোট্ট চারা এনে
রোপন করেছিলাম আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির পশ্চিম কোনায় –
ঘন চাঁপার পাতার মধ্যে দিয়ে একদিন সূর্যাস্ত দেখব বলে।
সেই চাঁপাগাছ এখন আমার দোতলা বারান্দা ছাড়িয়ে
অনেক, অনেক ওপরে,তর তর করে বেড়েই যাচ্ছে।
ভয় করে আমার –
আর কয়েক বছর পরে আমার জানলা থেকে ফুল দেখতে পাবো তো ?
ঋতু মেনেই ফুল -
আর তারপর ফুলে ফুলে গর্ভসঞ্চার।
ফল হয়ে ওঠবার দুরন্ত আকর্ষণে।
একাউন্টেন্সীর ডাবল এন্ট্রি সিস্টেমের মতো
ট্রায়াল ব্যালেন্স মিলবেই প্রকৃতিতে।
ছাড় নেই কোনোই।
ঠিক নিয়মেই রানীর ঋতু বদলায়।
কখনো গনগনে আঁচে
কখনো আবার নতুন সৃষ্টির ধারাজলে।
ফাঁকা ধানক্ষেতে হেমন্ত এসে চলে যায় –
বসন্তের সূচনারম্ভে।
বিস্তার, বিস্তার এবং বিস্তার।
পেরিয়ে গেল চাঁপাতলা।
বিকেলের গরম রোদ চকচকে উজ্জ্বল –
তেরছা করে পড়ে চাঁপাপাতায়।
কিছু ফুল ঝরে পড়ে নীচের চাতালে।
কখন সময় হবে ফুল ফোটানোর।
সৃষ্টির ক্রিয়া অন্তঃসলিলা সরস্বতী।
ঠিক বহে যায় সকল সময়।
কোথাও তো নেই কোনো মানা তার।
তবে কি আমরা প্রকৃতিসৃষ্ট নয় ?
কেন তবে এতো সামাজিক গন্ডী’র স্থুল অমাবস্যার অন্ধকার ?।
কেন তবে ঋতুর নির্ঝরে বেগবতী রমনী’র –
গরলের দিনে সরে থাকা’র আজন্মলালিত অনুশীলন।
কেন তবে বাণে’র চতুর্থী শেষে –
শূচিতা’য় ফেরা ?।
ঝলকে ঝলকে দেহে আবির্ভাব।
তার না আছে সময়, না আছে নির্দিষ্ট রীতিনীতি।
উদ্ভাসিত উত্তেজনার চরম মুহূর্তে কল্পিত অশালীন প্রত্যয়।
স্থির বিশ্বাসী শূচিতা’র আন্তরিক গলগ্রহ !
বয়ে চলে সময়ের চাকা –
প্রজাপতি উড়ে যায় পরাগমিলনে।।
উঁচু ডেসিবলে শব্দ পড়েছে বাঁধা,
মিতাচার আজ অনীহা’য় বেপরোয়া
কত ভাবে তাই উদ্দাম গলা সাধা।
বিদ্বেষ যেন ছায়াতেও গরিয়ান,
উটপাখী তবু মাথা তুলে ভেবেছিল
ছায়া ক্ষয়ে যায়, হারাবেই সম্মান।
শুনি এই বাণী আমাদের পোড়া দেশে –।
আবেগ এখন ইস্তেহারে’তে ভেজা
তাই যেতে চায় অজানা নিরুদ্দেশে।
শ্রেণী ভাগ করে খোঁজা হবে ফুলফোটা,
প্রেম বদলাবে প্রাচীন সংজ্ঞা ভুলে -
ধ্বনিভোটে পাবে নতুন শব্দ “নোটা”।
ক্লোন উপাচারে ফুটবে নতুন ফুল।
শ্লোগানের সুরে ডাকবেই সব পাখী
নদীর জলেতে উপছোবে নাকো কূল।
আষ্টেপৃষ্টে ছড়াবে কি তার জাল ?
ব্যক্তিস্বার্থ কোথায় লুকোবে তবে
কোথায় হারাবে মননের দ্রোহকাল ?।
#
©গৌতমদত্ত
Comments
Post a Comment