আমার কবিতা - ৭
ঢেউ এসে লেগেছিল খেজুরপাতায়।
মুহূর্ত জানে শুধু বহুবার
ছুঁয়েছিল নোন্তা আবেগ।
এইটুকু আর কিছু নয়
বয়ে গেছে অনেক সময়
এলোকেশী জানে আজ খেজুরকাঁটায়
মিশে আছে শুকিয়েছে কতো ঢেউ আর
ঝুপড়ির তীরে তীরে সাগরসঙ্গম।
©গৌতমদত্ত
২০শে অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
#
চতুর্দশী—
আজ রাতে এসো তবে।
চৌকাঠের প্রদীপ নিভে যাবে ঠিক -।
অন্ধকার চাই আমাদের...
ঠিক যতোখানি অন্ধকার হলে শরীরে শরীর
আর উন্মোচিত পদ্মের জলজ উত্তাপ
মেখে নেওয়া যায় যুদ্ধজয়ে।
অন্ধকারগুচ্ছের মাঝে
শব্দহীন রেখো চরাচর।
নাহলে বিঘ্নিত হবে প্রথম সঙ্গম।
তারা-খসা আওয়াজেও স্পর্শের অসুখ -
মুঠো ভরে পেতে চাই আজকের রাত
গ্রোগ্রাসে গিলে নেবোচতুর্দশী সুখ আজ
নিস্তব্ধ জোৎস্নায়।
©গৌতমদত্ত
১৮ই অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
#
ইতিহাস—
কতো রাত ভেসেছিলো অভিমান জ্বরে
যমুনায় রুপো চাঁদ কাঁকনের শ্বাসে
নিঝুম শ্রমিক বস্তি আফগানি স্বরে
চুপিচুপি কথামালা প্রহরীর ত্রাসে।
ভালোবাসা মরেনি’কো যমুনার তীরে
উঠছে আশ্চর্য্য এক কোজাগরী আলো
চাঁদ এসে ঢুকেছিলো হোগলার ফাঁকে
গলা জড়াজড়ি আর ঘুটঘুটে কালো।
প্রেম ছিল রাজা ছিল পাথরের মালা
কেল্লার জানলায় অভিমানি চোখ
মুদ্রায় সবকিছু পাওয়া হলে পরে
আফগানি আঙুলেতে পড়েছিল কোপ।
ইতিহাস কয় কথা ভালোবাসাবাসি
কালের চাকায় ঘোরে রাজাদের নাম
বুড়ী চাঁদ সেদিনেও উঁকি মেরেছিলো
ইতিহাস লেখে নাকো শ্রমিকের ঘাম... ।
ধারা ঠিক খুঁজে পায় সংখ্যার আলো
ব্যবহার ততোটুকু বাকি গৃহহীন
শুধুই আকাশ জানে গাছ পাবে জল
বাকি সব ঝরে পরা ফোয়ারা রঙিন।
©গৌতমদত্ত
১৮ই অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
(ঋতুযানএর২০১৮ কবিতা সংকলনে প্রকাশিত)
#
কেউ যেন বলেছিলো কবে কবিতা লিখতে হলে রোজ
নতুন আলোক চাই ঘরে-
কবি-জন্ম প্রহরে প্রহরে।
উঁচু বুকে ছাতা পড়ে স্তাবকেরও ঘুম পায় মাঝে
গানওয়ালা গান গেয়ে ফেরে
ফুয়েরার্ আজও তাড়া করে।
নতুন এ কথা কিছু নাকি পোল্যাণ্ড তো সমাধি খুঁড়েছে
মন্বন্তর হাজারের ঘরে
বরফে’তে কোটি চাপা পড়ে।
কবিতা শব্দের খেলা, জানি আঙুলেতে কালি হারিয়েছে
ডট্ ডট্ ডট্ আজ সব
কোথায় খুঁজবে অনুভব।
নোংরামো গেলানো সহজ কাজ করা আপাত দুরূহ
শুধু বাণী ঘিরে আছে দেশ
এক যুগ আহ্লাদে শেষ।
তুলসী’তে ধোওয়া সব কাদাখোঁচা ঠিক ওড়ে রোজ
ঘরে ঘরে গোপন তালাশ
ডাক এলে সন্ধ্যায় ত্রাস।
‘অদ্ভুত আঁধার’ আজ কবে থেকে দেখা গেল ঠিক
কে যে কার চিরুনী খোঁচায় -
ভালোবেসে ভালো থাকা যায় ?
©গৌতমদত্ত
১২ই অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
(ঋতুযানএর২০১৮ কবিতা সংকলনে প্রকাশিত)
#
একমুঠো আলো দিতে পারো ?
দাও না গো, কিছু সাদাকালো
দোয়েলে’র ডাক মাখা ছল -
এইটুকু হোক সম্বল !
হাজার বছর বাঁচা দায়
জীবনে জীবন ছলকায়
অতো দিন পথে পথে চলা
কবি পেরেছিল, আমি নিস্ফল।
তাও পারি, গাঢ় শ্বাস পেলে
পায়ে পায়ে চলে অবহেলে
আজন্মের মতো হেঁটে যেতে
ভালোবেসে পরতে পরতে।
রামধনু রঙ দেখে চিনে
বর্ষাও ফিরে যায় আশ্বিনে
তারপরে লেপ কাঁথা বুনে
ভালবাসা আসে ফাল্গুনে।
মাঝের সময়টুকু ধরে
হাতখানা দিও আলো ভরে
আঙুলের ফাঁকে সেই আলো
যেন বেনারসী জমকালো।
দূর থেকে ডাক দিও তবে
শুনে নেবো ঠিক অনুভবে
আলো আর ডাকে মিলেমিশে
চলে যাবো স্বপ্নের দেশে।
©গৌতমদত্ত
১১ই অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
(ঋতুযানএর২০১৮ কবিতা সংকলনে প্রকাশিত)
#
ফেরা—
দক্ষিণে যাওয়া মানা হয়ে গেছে—
বারণ করেছে দখিন বাতাস
কি করে ভরাবো আমার জন্মতৃষ্ণা
কেশ উদ্গম হলে বুঝিয়েছি কতো
এ শহর অবিরত পলাশ হারায়...
জীবনতো টেনে যেতে হয় তবু।
সাইকেলে চেন খুলে গেলে
নামতেই হয় নীচে—
কালো কালি ভরে যায় আঙুলে আঙুলে
নিষ্পন্দ গতি ফেরে পুনরায় !
এমন কি কথা ছিল ?
নিরুত্তাপ নির্লিপ্তি ঘুরে যায়
জানলায়, দরজায়, চৌকাঠে, মেঝেময়—
হাওয়ায় ওড়ে না আর ফেলে দেওয়া ঋণ।
তবু থাকি অপেক্ষায় –
যদি হাওয়া বয়।
জড়ো ক’রে সবকিছু
মুঠোর আশ্রয় আর
সময়ে সময়।
©গৌতমদত্ত
৭ই অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
#
কোজাগরী—
অরণ্য-জোৎস্নায় হেঁটে যেতে যেতে
দেখেছি কোজাগরী আলোপথ
চোখ বন্ধ করে গ্রহণ করেছি তার
মৃদু অথচ স্নিগ্ধ উত্তাপ
আইসক্রিমের মতো নরম স্বাদু এবং
অবিনশ্বর।
এখনো ভালোবাসা মানে জোৎস্না
রাতের বিছানা জুড়ে উদ্দাম প্রেমে
কোজাগরী ধাক্কা খায় জানলার পর্দায়।
©গৌতমদত্ত
কোজাগরী, ৫ই অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
#
বিজয়া-দশমী-
নীচু হয়ে প্রণাম করতে হবে বলেই
বোধহয়—
গুরুজনেরা চলে গেছে কবেই—।
সাথে গেছে নাড়ু, নিমকি আর
দশমীর সিদ্ধি’র গ্লাস।
এখন প্রণাম পাই কচিৎ কখনো
হাঁটুতে হাতের স্পর্শে।
আর পাই সারারাত যন্ত্রণা বাতের ব্যথায়।
কোলাকুলি নেই আর—
নেই আর ঝুঁকে পড়া প্রণামের হাত
মাথায় হাতের তালু হারিয়েছে আদরের পথ
শাঁখায় শাঁখায় সিঁদূরের ঠোকাঠুকি নেই আর—
নেই আর চুমোছোঁয়া হাতখানা।
লাল পাড় কোড়াশাড়িচলে গেছে অযোধ্যায়
এসে গেছে হাতে হাত বিজয়ায়
মাটি হ’য়ে ভেসে যায় নীলকণ্ঠ পাখী গঙ্গায়...
বিজয়ার পোষ্টকার্ড হারিয়েছে
আবেগের অক্ষর রোমান আড্ডায়...
©গৌতমদত্ত
৩রা অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
#
ভুলে গেছি হিসেবের রঙ।
ভুলে গেছি হিসেবের রঙ।
নগদ, বাকি, জাবদা, খতিয়ান সব কিছু
হারিয়েছি ঝুনো মনে—
বাকি রয়ে গেছে জানা বোঝা মানা
আর উড়োখই জীবন।
তবু মাঝে মাঝে কনে দেখা আলো—
বড়ো ভালো।
হৃদয় নিষিক্ত হ’লে নতুন কবিতা
চোখ মুখ ঠোঁট ছুঁয়ে শরীরে গড়ায়...
আত্মরতি’র স্বাদ চরম সীমায় ওঠে
মৈথুন তৃপ্ততা পেলে—। তারপর
জেগে ওঠে চর জল নেমে গেলে
পড়ে থাকে আগমনী -
হৃদয় পেরোলে।
সহজ কঠিন ছন্দ আর দুরারোগ্য অসুখ
সব কিছু সেরে যায়
পুনরায় তুমি এলে পরে...
©গৌতমদত্ত
২রা অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
#
নির্জন—
একবার হাতখানা ধরো
যদি পারো—
এ ফাঁকা দালানে।
কেউ নেই আজ
শুধুই দুজন— আর
চাতালেতে ফাঁকা ঘট
একা শুধু।
কোলাহল নেই আজ
ভাঙা রাজ্যপাট
আমি রাজা—
তুমি আজ রানী।
ঝাড়বাতি দেবো জ্বেলে
প্রণয় গভীর হলে—।
নয়হবে মাঝ রাত
হাওয়া এসে ছুঁয়ে যাবে দুজনেরই মুখ
একাদশী অন্ধকারে।
তারপরে,
তোমার নতুন সাজ আলুথালু করে
সাজাবো শব্দের মানে—
আর তারপরে বুঝে নেবো
কতটা গভীর হ’লে
ভালোবাসা জমে উঠে ক্ষীর হয়ে যেতে যেতে
কলাপাতা মুড়ে নেয়
পাতুরী’র মতো...
©গৌতমদত্ত
১লা অক্টোবর, ২০১৭।
কলকাতা।
#
দুগ্গা – ৬
ছাইরঙা আকাশ আজ
উদাস কি ?
আমার মনের মতো !
সবাই-ই ব্যস্ত
অন্ততঃ চলাফেরায়—
কতো কিছু রঙ
মেঘলা’য় ফিকে হয়ে যায়
কাজের মাসী’রা না এলেই
মনে হয় জঙ্গলে চলে যাই
হীরের ছটার মতো রাগ
চলকায় ঘরের কোনে কোনে।
কতো দুগ্গা-ও জঞ্জাল ঘেঁটে
খুঁজে চলে পেটের পারানি—
অপু’রাও সাথে থাকে তার...
নবমীর রাত নামবে শহরে
অনেক জঞ্জাল ও
পুজোর কটা দিন কতো কিছু মিলে যায়
ডাস্টবিনে...
©গৌতমদত্ত
২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা। দুর্গানবমী।
#
দুগ্গা – ৫
অষ্টমীতে মেঘলা আকাশ
নীল নেইকো আজ
বাদল আকাশ আজ সকালে
ধূসর কালো সাজ।
হণ্ডা সিটি থেকে হাই হিল পা’টা
ম্যাডক্স্ স্কোয়্যারের সামনের রাস্তায়।
আমার দুগ্গা মেঘলা দিনেও
রোদ-চশমায় আড়াল খোঁজে-
ঝক্ঝকে শরীরে পুজো পুজো গন্ধ
সারাটা রাস্তায় ;
আরেক দুগ্গা ছুটে আসে...
হাতে তার একরাশ গোলাপকুঁড়ি।
দুটো গোলাপ এগিয়ে দেয় ডাঁটাখানা ধরে—
বলে – দশটাকা দাওনা গো দিদি...
একদম টাটকা... দেখো—
রোদ-চশমা’র মধ্যে দিয়ে
টাটকা গোলাপ শুকনো দেখায়...
মুখে শিখে নেওয়া বুলি- ‘মাপ্ কর্’
ফ্যালফ্যালে চোখে আমার দুগ্গা
গোলাপ হাতেখুঁজতে থাকে
খুঁজতেই থাকে -
দু হাজার সতেরো’র দুগ্গা-কে...
©গৌতমদত্ত
২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা। দুর্গাঅষ্টমী।
#
দুগ্গা – ৪
নীলচে আকাশ মেঘ করেছে
বৃষ্টি নামলো- বলে
খালপাড় আজ জলে ভরে গেছে
রাস্তাটা সঙ্গীন।
আমার দুগ্গা কাঁচের চুড়ি
বাবু’দের দেয়া ফ্রকে
খালপাড়ে আজ সকাল থেকেই
খুঁজে ফেরে যেনো— কাকে !
আরেক দুগ্গা এই বয়সেই
পোয়াতি হয়েছে সবে
মাস দুই আগে কে যেনো কে জানে
মাঝ রাতে উৎসবে...
এই ভাবে চলে খালপাড়ে আর
শহরে ব্যস্ত দিন
মাঝরাতে শুধু খুন হয়ে যায়—
দুগ্গা অর্বাচীন।
©গৌতমদত্ত
২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা। দুর্গাসপ্তমী।
#
দুগ্গা – ৩
সাদা মেঘের দল ওড়ে ওই
নীল আকাশের গা’য়
তোমার ছবি অকপটে
মনেই নেচে যায়
কারো’র সত্তর’
কারো’র আশি’
কারো’র আবার নব্বই’
পেরিয়ে হাঁটা...
মা আসছে এতগুলো বছর ধরে—
সর্বজনীন আর সার্বজনীনে
দুর্গা আর দূর্গা’র চক্মকি
প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে মায়াবী আলো’য়
আমার কৈশোরের দুগ্গা’রা
এখনো সমান স্বচ্ছন্দ।
তেত্রিশ বছর ধরে দেখেই চলেছি সেই
দুগ্গাদের—
সেই হাসি সেই চোখ সেই ঠোঁটটেপা...
সেই নতুন জামা শাড়ি জুতো সব এক
সেই বিশেষ্য সেই বিশেষণ সেই ক্রিয়া
আর অব্যয় চাহনি –।
কতো দুগ্গা বিজয়া’য় যায় রোজ-
হে আমার ব্যস্ত শহর...
©গৌতমদত্ত
২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা। দুর্গাপঞ্চমী।
#
দুগ্গা – ২
নীল আকাশে তোমার মনে
লুকোচুরি অকারণে
শহর ঘুম থেকে জেগেছে অনেকক্ষণ
এখনো জঞ্জাল ফুটের কিনারে
কচুরী আর জিলিপির গন্ধে
মৌন সকাল শহর।
মা’য়ের চোখে জল ফেলিয়েই
দুগ্গা শ্বাস নিলো তীব্র চীৎকারে।
এখনো খবর পৌঁছয়নি নীচে-
যেখানে অনন্ত অপেক্ষায় সিগারেট ধোঁয়া
পাক খায় আর পাক খায় – আর
কয়েকজোড়া চোখ উৎসুক হয়ে ভাসে
উৎকন্ঠ অধীর ছিন্নভিন্ন মুখ।
বংশের বাতি কি বেরোলো
তৃতীয় বারে—
এ শহরে ?
©গৌতমদত্ত
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা। দুর্গাচতুর্থী।
#
দুগ্গা – ১
নীল আকাশে তোমার মুখ
দেখে যাচ্ছি সকাল থেকেই-
বকুল পাতার ফাঁক দিয়ে
জানলা গলে শরতের রোদ আর মেঘ
একপাশে ফেলে রেখে
আজ শুধু তোমাকেই...
ডাস্টবিন থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার তুলে নিয়ে
দুগ্গা আমার ফুটপাথে বসে খোঁজে
শহর সকাল।
কর্পোরেশনের গাড়ির জলের তোড়ে
বাসি মুখ ধোয় আমার শহর
আজ।
ব্যানার এর আড়ালে পুরোনো জানলাগুলো
ঢেকে গেছে বিজ্ঞাপনে।
এ শহর জানে সবকিছু
সবকিছুই...
©গৌতমদত্ত
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা। দুর্গাচতুর্থী।
(ইউ.কে. র লীডস্ থেকে আগামী শারদীয়া’র “চৈতালি হাওয়া” সংখ্যার
জন্য প্রেরিত এবং গৃহীত – সৌজন্যে মিলি এবং চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়)
#
তারপরে যদি চলে যেতে চাও যেও
সেইটুকু হোক সবুজ পাতায় জল
তেমন করেই একবার শুধু চেয়ো।
চারিদিকে আজ ঈশারার হাতছানি
মনও মাতাল তার নেশাতেই জানি
অনুরোধ তবু, দুধটুকু চিনে নিও
সর্বদা জলে ভরবে না মনখানি।
#
চাঁদের গুহার দিকে চেয়ে ভালবাসা দিয়ে গেছ কত
দূর থেকে ছুঁয়ে গেছি তোমার সে অকারণ ছন্দগন্ধ
কাছে নিয়ে পারিনি’তো বোঝাপড়া করে নিতে সেই স্বাদ
গ্রহণে অক্ষম হয়ে তবু খুঁড়ে চলি শব্দ বর্ণমালা
এখনো দুপুরে রোজ সূর্য গনগনে হ’লে ফিরে দেখি
মোচড়ানো পংক্তির চিরস্থায়ী ভাড়াটিয়া রূপকল্প
সমীকরণের মতো করে বুদ্ধির শক্তিতে ধার দেয়।
অকপট অগনন কতো পাতা উড়ে গেছে হারিয়েছে
পেঁজা পেঁজা তূলো হয়ে ঘুড়ির মতন উড়ে কেটে গেছে
কোন নীল আকাশের নির্বিকার বেদনার ফেনা হ’য়ে।
©গৌতমদত্ত
১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা
#
দূরে যেতে চাও যাও
সুতোখানা ধরে রেখো তাও।
সুতো একবার ছিঁড়ে গেলে
আকন্দআঠায় যদিও দু’মুখ জুড়ে দাও
টান পড়লেই ভোকাট্টা আবার...
অনেক ছেঁড়া ছেঁড়া তুলো চরকায় বুনে বুনে
জুড়ে গিয়েছিল কোনো এক দিন অকস্মাৎ
সাতরঙা রামধনু রঙ জুড়ে জুড়ে অবিরল মেঘ
লুফে নেয় পৃথিবীর যতো চোখ –
বিধবা’র সাদা থানে সেই সব সুতো
ভেঙেচুরে বিচ্ছিন্ন অমোঘ।
তবুও তো মাঝেমাঝে ইচ্ছে করে না কি ! –
মাঝরাতে পিছুটান ছেড়ে নিবেদিতা সেতু’র মতন
ভারহীন থাকা !
ওপরে তারা ভরা রাত্রির আকাশ আর
নীচে পলি জমা ভাগিরথী জল - !
©গৌতমদত্ত
১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭।
কলকাতা
#
এসো নাগো—
শাঁখ’টা বাজানো শেষ হ’লে একবার এসো বারান্দায়।
গলায় আঁচল জড়িয়ে মা’য়ের দ্রুত ঘরে ঘরে ঘোরা –
স্মৃতি’র সত্তর মিলিমিটারে পাক খেয়ে যায়।
‘ভাত খাওয়া কাপড়ে সন্ধ্যে দিতে নেই’ – ঠাক্মা বলতেন।
এক হাতে পেতলের কমণ্ডুলু অন্য হাতে ধূনোর ধোঁ’য়ায়
সন্ধ্যে ঠিক টুক ক’রে ঢুকে পড়তো আমাদের পড়া’র ঘরে।
আকাশ তখনো নীল ছড়াতো কালো রাতের অপেক্ষায়।
ফ্ল্যাটে’র ছোটো ছোটো ঘরে বর্ষায় শাড়ি লম্বা হয়ে শুকোয়।
আর তুমি শুকোও বোকাবাক্সের সিরিয়ালে !
তবু যে এখনো শাঁখখানা বাজাও – সন্ধ্যেকে ডাকো – ধূপ দাও
দু’টো ঘরে, ড্রইং-এ – বেশ লাগে।
ঠাকুর প্রণাম সেরে এসো একবার। বোসো পাশে।
খুব ইচ্ছে করে ছোটোবেলা’র সেই মা, কাকীমা, ঠাক্মা’র
চুল বাঁধা সেরে গা ধুয়ে বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলের সেই -
কাচা শাড়ির গন্ধ নিতে নিতে যদি ফের নিয়ে নিতে পারি
এক আধ্লা স্মৃতি তোমার এই ছাপা শাড়ি থেকে !
এসো নাগো পাশে –
©গৌতমদত্ত
৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১৭
কলকাতা
#
কালোকাঁচ—
কালো কাঁচে বেশ লাগে আজকাল –
আলো কমে গেছে চারিদিকে।
কতো রকম ফিল্টার ছিল আমার
রেড্ গ্রীন ইয়েলো ইউভি –
কালোসাদা নেগেটিভ আর
ভরাট কালো এ্যালবাম।
মা-বাবা’র বিয়ের ছবি পেলাম সেদিন
রেখে যাওয়া দেরাজের টানা ড্রয়ারে –
অল্প সিপিয়া
সাদাকালো অবিকল।
কোডাকের রঙে ফাংগাশ
জীবনের যন্ত্রণা আর
সমাজসংসার মিলে মিশে বিবর্ণ ঊর্ননাভ।
বাইকের শোরুমে ছেলেদের ভীড়ে
বাবা-মা’র শঙ্কিত মুখ।
উইপোকা বেড়ে গেছে সব ঘরে ঘরে।
কালো কাঁচে চোখ সইয়ে নেয় বেশ -
বুঝে নেয় সবকিছু।
©গৌতমদত্ত
১লা সেপ্টেম্বর, ২০১৭
কলকাতা
#
পাকদণ্ডী রাস্তার সাথে ভালোবাসার যে একটা
সম্পর্ক আছে তা জেনেছিলাম সেই কবে মনেও
পড়ে না আর লতানে গোলাপ গাছের মাচার
তলা দিয়ে রাস্তায় পড়তেই আচমকা ব্রেক কষে
থেমে পড়েছিল যে গাড়িটা সেই কার্শিয়ং-এর
ঢালু রাস্তায় সেই নেপালী ড্রাইভারটার আমাকে
কোলে তুলে নিতে কতখানি ভালবাসা ছিলো তা
চোখ বুঁজে এখনো আমি দেখতে পাই তারপরে
সেই পাকদণ্ডী পথের ছবি আবার দেখেছিলাম
শিলং এর রাস্তায় লাবণ্য’র সাথে সেই সব দিন
ফেলে রেখে বেচারা অমিত আজ কলকাতার
বড়বাজারে টাকা মাটি মাটি টাকার চক্করে
উদাসীন সংসারী হয়ে মোবাইলে গান শোনে
সাপলুডো খেলছে পৃথিবীর সংগে
চড়াই চলে গেছে ভালোবাসায় উৎরাই নেমে
আসে যন্ত্রণা নিয়ে তার চেয়ে চিৎপুর রোড
ধরে ট্রাম বাস মটোর ঠেলা রিক্সা ভ্যান ঝাঁকা
মুটে হকার ফিরিওয়ালাদের পাশ কাটিয়ে হপ্তা’র
পশরা সাজাই জোড়াসাঁকো’র গলি থেকে বেরিয়ে
আসা খান-চারেক কবিতা আর খান-দুই লাবণ্যে
©গৌতমদত্ত
২৭শে অগাস্ট, ২০১৭
কলকাতা
#
শহর কলকাতা—
অনেক বেশি জ্ঞান দেবার স্বভাব হয়ে গ্যাছে বলে
যে লোকটা নেমে গেল সেন্ট্রালে তাকে আমি শুধু
বলেছিলাম যে দরজা’র পাশে না দাঁড়িয়ে একটু
এপাশে সরে দাঁড়ালেই তো পারেন কারণ আমি
অনেকক্ষন ধরেই দেখে যাচ্ছিলাম ওনাকে আসলে
কলকাতা বড়ো অসহিষ্ণু হ’য়ে গেছে রাস্তাঘাটে
বাসস্টপে গলি’র মোড়ে পার্কের বেঞ্চিতে মিক্সচারের
দাগের মতন গাঁটে গাঁটে।
আমাদের চেয়ে রাস্তার কুকুরেরা ভাল আছে আজকাল
আর কেউ নির্বীয্যকরণও করে না ওদের বৌবাজারের
পশু হাসপাতালে মনে হয় হাইরাইজ উঠবে মানেকা তো
সেদিনের মেয়ে আঠারোশ’ একষট্টি’তে পশুদের ও
হাসপাতাল গড়ে উঠেছিল খোদ কলকাতা শহরে।
শুয়োরে’র বাচ্ছা এখন প্রাগৈতিহাসিক হাই হিল থেকে
হাই টুকু নিয়ে হ্যালো থেকে হ্যালোজেনে ঢেকে গ্যাছে
মহারাণীর শহর কোম্পানীর বাগানে রবিঠাকুর ও গো-গো
স্ট্যাচু বনে গিয়ে নৃত্যনাট্য’কে লাটেই তুলে যদিও বা
সদনে এনেছিলেন তাও আজ ডাইনোসরেদের সাথে
মিশে গিয়ে ল্যাম্পোষ্টের নীচে নীচে ক্ষিধেমাখা হাতে
শরীর জুড়োতে চায় দু’টো পয়সা পাবে বলে আর সব
শব্দ ব্রহ্ম হয়ে ঝরে প’ড়ে ডিজে’র তাণ্ডবে বড় সাধ হয়
একবার তোমায় দেখি...।
©গৌতমদত্ত
২৭শে অগাস্ট, ২০১৭
কলকাতা
#
মুক্তি—
তোমার মনের ভেতরে একটা নদী আছে।
আমি রোজ দেখি কতো শালুকে’র ভীড়
ওই নদীতেই।
দোলে নাচে হাসে
আবার গানও গায়।
আর যেদিন আমার মন-খারাপের বিকেলবেলা
সেদিন যেন কেমনতরো !
শুকনো কচুরীপানার ভীড় –
জলও দেখা যায় না। বেগনে ফুল তো অনেক দূর্।
তবে, তোমার মন-খারাপের দিন
আমি ঠিক বুঝতে পারি।
জোরে জোরে হাওয়া
উথাল পাথাল শালুক ডাঁটায়
ফুলগুলো আশ্রয় চায় যেন –
ঠিক যেমন গভীর রাতে আবেগ জোয়ার এলে
পাশ ফিরে তোমার কাছে ঘেঁষে -
অন্ধকারে খুঁজতে থাকা কানের লতি।
অজস্র বর্ণের বাহারিয়ানায়
তোমার চালচিত্র।
স্থির অচঞ্চল প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
মাঝে মাঝে শুধুই খেই হারানো বিচ্ছুরণ।
জীবনানন্দের চাল ধোওয়া স্নিগ্ধ হাত কিংবা
দারুচিনি দ্বীপমালা থেকে অন্ধকারে তোমার আহ্বান।
আর
সেখানেই মুক্তি আমার আমাদের।
©গৌতমদত্ত
২৬শে অগাস্ট, ২০১৭
কলকাতা
#
বুরুডি -
বহতা নদীর মত এসো
কামরাঙা রঙ মেখে –
মধুমালতীর গন্ধে শরীর ভাসিয়ে
এসো বিকেলবেলায়।
বুরুডি লেকে’র কিনারে কিনারে
ধূপছায়া রঙ মাখা প্রজাপতি হ’য়ে
উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে ছুঁয়ে যেও
আমার শরীর আমার প্রাণ আমার উল্লাস
সবকিছু। যদি পারো একটু পরাগ
আকন্দ ফুলের থেকে নিয়ে -
ফোঁটায় ফোঁটায় এঁকে দিও পিঠে
আদিবাসী আল্পনা অমলিন।
সন্ধ্যে নামলে তবে –
মুছে যাওয়া সূর্যাস্তের অস্পষ্ট সোনালি আভায়
হেঁটে যাবো চার পা’য়ে
পশ্চিম দিগন্তে। তারপরে ফিরে যেও ঘরে –
একা একা সাঁতরাবো বুরুডি’র জলে।
ছল্ছল্ কল্কল্
জীবনের স্বাদ।
©গৌতমদত্ত
২০শে অগাস্ট, ২০১৭
কলকাতা
##
Comments
Post a Comment